ম্যাওঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও শ্রোডিঞ্জারের বিড়ালের সম্পর্ক!

ম্যাওঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও শ্রোডিঞ্জারের বিড়ালের সম্পর্ক!




কোয়ান্টাম মেকানিক্সে বিড়াল আসলো এরভিন শ্রোডিঞ্জারের এর কল্যাণে । তাঁর করা এই পরীক্ষণ কে “শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল” বলা হয়। আর এভাবেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সে বিড়ালের যাত্রা শুরু।

“শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল” অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এরভিন শ্রোডিঞ্জারের করা একটি Thought  Experiment যা কোয়ান্টাম সুপারপজিশন  সম্পর্কিত একটি প্যারাডক্স। Copenhagen interpretation এর সাথে দ্বিমত প্রকাশ করার জন্যই তিনি এই সমস্যা উত্থাপন করেছিলেন।

ইতিহাস

আধুনিক পদার্থবিদ্যার নতুন এক ধারা- কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স। এর পেছনে ছিলেন ম্যাক্স প্লাঙ্ক, হাইজেনবার্গ, নিলস বোর ,এরভিন শ্রোডিঞ্জার সহ আর অনেকে।এই বিজ্ঞানের নতুন শাখা অবগত করল –  আমাদের পরিচিত জগতের বাইরেও রয়েছে অসীম সংখ্যক সম্ভাবনার জগত।

১৯৩৫ সালে শ্রোডিঞ্জার একবার নিলস বোর কে বললেন, তরঙ্গসমীকরণ পদার্থবিদ্যায় সম্ভাবনা ঢুকিয়েছে। এটা ঠিক না। পদার্থবিদ্যা কেন সম্ভাবনার আওতায় কাজ করবে? আমি চেষ্টা করছি কোয়ান্টাম থিওরি ভুল প্রমান করব।বোর বিরক্ত হয়ে বললেন, আপনি নিজেই কোয়ান্টাম থিওরির জনকদের একজন। আপনি নিজের থিওরি ভুল প্রমান করবেন?-হ্যাঁ।-কিভাবে?-একটা চিন্তা পরীক্ষা দিয়ে। এই চিন্তা পরীক্ষাটিই ছিল শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল পরীক্ষা 

আরউইন শ্রোডিঞ্জার

অস্ট্রিয়ার খ্যাতনামা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আরউইন শ্রোডিঞ্জার (১৮৮৭-১৯৬১) আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একজন চরিত্র । “শ্রোডিঞ্জার সমীকরণ” প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ১৯৩৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি তার বিখ্যাত বিড়াল পরীক্ষাটি করেন ।


কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন

১৯২৫-১৯২৭ সালের মধ্যে নিলস বোর এবং হাইজেনবার্গ মিলে একটি থিওরি প্রতিষ্ঠা করলেন- “কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন”। আণবিক পর্যায়ের বস্তুর আচরণ নিয়ে এই তত্তে বলা হয়েছে ।

বিড়াল পরীক্ষা

সাল ১৯৩৫।। কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন আমাদের দৃশ্যমান বস্তুগুলোর উপর প্রয়োগ করলে কী হতে পারে, এই চিন্তা থেকে শ্রোডিঞ্জার তার পরীক্ষা শুরু করলেন ।

শ্রোডিঞ্জার একটি আবদ্ধ বাক্সের কল্পনা করেন যার ভিতরে একটি বিড়াল, কিছু তেজস্ক্রিয় পদার্থ, একটি তেজস্ক্রিয়তা ডিটেক্টর, একটি হাতুড়ি এবং একটি ফ্লাস্কে কিছু হাইড্রোসায়ানিক এসিড আছে। পুরো ব্যবস্থাটা এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ যখনি বিকিরণ নির্গত করবে তেজস্ক্রিয়তা ডিটেক্টর সেই বিকিরণ শনাক্ত করবে এবং এর সাথে সংযুক্ত হাতুড়িটি ফেলে দেবে যেটা এতক্ষণ ওঠানো ছিল, আর এই হাতুড়ি যেয়ে আবার এসিডের  ফ্লাস্ককে ভেঙে ফেলবে। হাইড্রোসায়ানিক এসিড বা হাইড্রোজেন সায়ানাইড (HCN) একটি মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থ; ফলে এটি সহজেই বিড়ালটিকে মেরে ফেলতে পারে। সুতরাং তেজস্ক্রিয় পদার্থ  যদি বিকিরণ নির্গত করে তবে বিড়ালটির আর বাঁচার সুযোগ থাকবে না।

বাক্সটা বদ্ধ বলে এর ভিতর কি হচ্ছে তা আমরা জানি না। যদি তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিকিরণ নির্গত করে তবে বিড়ালটি মরে যাবে আর যদি না করে তবে বিড়ালটি বেঁচে যাবে। বাক্সটা না খোলা পর্যন্ত আমরা কখনই জানতে পারব না বিড়ালটা বেঁচে আছে না মরে গেছে কারন আমরা জানতেই পারছি না তেজস্ক্রিয় পদার্থটি বিকিরণ নির্গত করছে কি না।তাই বদ্ধ অবস্থায় বিড়ালটা মরেও যেতে পারে আবার বেঁচেও থাকতে পারে অর্থাৎ বিড়ালটার মৃত থাকার সম্ভাবনা ১/২ ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও ১/২।

জীবিত বিড়াল, মৃত বিড়াল

উত্তর খুব সোজা । হয় জীবিত, নয় মৃত। তাই না ?

কিন্তু , এত সোজা নয় কাহিনী। বিড়ালটি জীবিত “অথবা” মৃত নয়, বরং এটি একইসাথে জীবিত “এবং” মৃত। আবারও বলছি, বিড়ালটি একইসাথে জীবিত এবং মৃত।

এই চিন্তন পরীক্ষার মূল রহস্য কি?

এর মূল বক্তব্য হল একটি ফোটনকে আলাদাভাবে আটকে রেখে তাকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয় কারণ পর্যবেক্ষণ করা মাত্রই ফোটনটি ধ্বংস হয়ে যাবে।



সুপারপজিশন

একটি কোয়ান্টাম কণার বিভিন্ন রকম “অবস্থা” থাকতে পারে। যেমন, একটি কোয়ান্টাম কণা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে কণা হিসেবে থাকতে পারে, আবার তরঙ্গ হিসেবেও থাকতে পারে। কোপেনহেগেন তত্ত্ব অনুযায়ী, কণাটিকে অবজার্ভ করার আগ পর্যন্ত সে একইসাথে কণা এবং তরঙ্গ –উভয় অবস্থাতেই আছে। এই “উভয়” অবস্থাটিই হল সুপারপজিশন।

এই তত্ত্ব দৃশ্যমান জগতের বড় কোন বস্তুর উপর প্রয়োগ করলে তার ফলাফল কেমন হবে, তা ব্যাখ্যা করার জন্যই শ্রোডিঞ্জার সূত্রপাত করলেন তাঁর বিখ্যাত থট এক্সপেরিমেন্টের। বাক্সটি খোলার আগ মুহূর্তে বিড়ালটির জীবিত এবং মৃত অবস্থার সমন্বয়টি হচ্ছে তার সুপারপজিশন অবস্থা। কেবলমাত্র বাক্স খুলে দেখার পরই এটি হয় মৃত অথবা জীবিত দুইটির একটি অবস্থায় আসতে পারবে।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও বিড়াল

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দিয়ে যদি ব্যবস্থাটা বিবেচনা করি তবে বিড়ালটির আইগেনস্টেটগুলো হবে (1/√2) | Live >  ও  ( 1/√2) | Dead >।

তাই বিড়ালটির ওয়েভ ফাংশনটি হবে অনেকটা এরকম

Cat > = ( 1/√2) | Live > + ( 1/√2) | Dead >

কিন্তু কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন  অনুযায়ী ওয়েভ সমীকরণ বা শ্রোডিঞ্জারের সমীকরণ থেকে যে একগুচ্ছ সমাধান বের হবে (সমীকরণটি লিনিয়ার ধরণের। তাই একটির বদলে একগুচ্ছ সমাধান পাওয়া যায়) তার কোনটি মিথ্যা নয়। সবগুলো ফলাফলই একইসাথে কার্যকর। ওয়েভ ফাংশনটি ব্যবস্থাটির সব সম্ভাব্য অবস্থার সম্মিলিত রুপে থাকে। কিন্তু আমরা পরিমাপ করলে যেকোন একটি অবস্থাই দেখতে পাই।

অন্য ভাবে বললে আমরা পরিমাপ করার আগে কোন কোয়ান্টাম ব্যবস্থা একইসাথে সমস্ত সম্ভাব্য অবস্থায় থাকে। একে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন বলে। আমরা পরিমাপ করার সাথে সাথেই ব্যবস্থাটি যেকোন একটি অবস্থায় চলে যায়। একে ওয়েভ ফাংশন কোল্লাপ্স (Wave Function Collapse) বলে। এই রহস্যময় ব্যাপারটাকে ভুল প্রমাণ করার জন্যই শ্রোডিঞ্জার এই বিড়াল সমস্যা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।

তো বিড়ালের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ওয়েভ ফাংশনটি অর্ধেক মৃত  ও অর্ধেক জীবিত এর সম্মিলিত রুপ। তাই বিড়ালটিরও একইসাথে মৃত ও জীবিত থাকা উচিৎ অর্থাৎ সুপারপজিশনে থাকা উচিৎ। ব্যাপারটা সাধারণ কমনসেন্সে অসম্ভব। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যাও তো মিথ্যা নয়। এমনকি কোয়ান্টাম সুপারপজিশনেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।



ডাবল স্লিট পরীক্ষণের কথা আমরা সবাই জানি। এখানে আলোর ব্যাতিচার ঘটে। অনেক ফোটনের জন্য কোন সমস্যা হয় না, কিন্তু যখনই ফোটনের সংখ্যা একদম কম করে দেওয়া হয় তখনি বড় সমস্যা দেখা যায়। যদি একবারে একটি করে ফোটন যায় তবে ফোটনটি যেকোন একটি ফুটো দিয়ে যাবে। ফলে ব্যাতিচার করার জন্য দুটো তরঙ্গ পাওয়া যাবে না বিধায় ব্যাতিচারও হওয়ার কথা না। কিন্তু মজার কথা এখানেও ব্যাতিচার ঘটে। মানে একটি ফোটনই দুটো ফুটো দিয়ে গিয়ে দুটো তরঙ্গ উৎপন্ন করে, এই তরঙ্গদ্বয় ব্যাতিচার ঘটায়। একটি ফোটনের দুটো ফুটো দিয়ে যাওয়া একমাত্র সুপারপজিশন দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। আরো মজার কথা হল যখনই আমরা যন্ত্রপাতি নিয়ে বের করে ফেলি ফোটনটি আসলে কোনপথ দিয়ে গেছে, তখনই ফোটনটি যেকোন এক অবস্থায় চলে যায়। আমরা ফোটনকে যেকোন এক ফুটো দিয়েই যেতে দেখি। ফলাফল হিসেবে আর কোন ব্যাতিচার পাওয়া যায় না। ব্যাপারটা আসলেই রহস্যময়।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স , বিড়াল ও প্যারালাল ইউনিভার্স

তো বিড়াল আর ফোটনের সমস্যার সমাধান কি? সমাধান হিসেবে Many World Interpretation  এর কথা বলা যেতে পারে। এই ইন্টারপ্রিটেশন বা তত্ত্ব অনুযায়ী বিড়ালটিকে বাক্সের মধ্যে রাখার পর বিড়ালটি একইসাথে জীবিত ও মৃত অবস্থায় থাকবে। কিন্তু বাক্স খোলার সাথে সাথেই বিড়ালের দুই অবস্থার জন্য দুটি ভিন্ন জগৎ তৈরি হবে এবং প্রত্যেক জগতে বিড়ালটি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকবে। একটা জগতে আমরা বিড়ালটাকে দেখব মৃত এবং অন্য জগতে দেখব জীবিত। দুটো জগতের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই বলে আমরা শুধু একটা জগৎ সম্বন্ধেই জানতে পারব। ফলে বাক্স খোলার পর আমরা বিড়ালটাকে জীবিত-মৃত দেখার বদলে শুধু জীবিত অথবা মৃত দেখব।

বিষয়টাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে বলা যায়, বিড়ালের সাথে আমাদেরও অনুকৃতি সৃষ্টি হবে এবং প্রত্যেক অনুকৃতি ভিন্ন ভিন্ন জগতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকবে। আমাদের প্রতি ঘটনারই যেহেতু অসীম সম্ভাব্যতা রয়েছে তাই প্রতি মুহূর্তেই এরকম অসীম সংখ্যক জগৎ তৈরি হতে  থাকবে।

বিড়াল সমস্যা ও এর সমাধান

১৯৫৭ সালের দিকে Huge Everett তাঁর Ph.D থিসিসে বললেন, শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল একই সাথে জীবিত এবং মৃত। কারন সেসময় জগত দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। দুই ভাগই সত্য । এক জগতে বিড়ালটি জীবিত অন্য জগতে মৃত। আবার জগত দুটি একই সময়ে একই জায়গায় আছে। তারপরও তারা আলাদা। এই হাইপোথিসিসের নাম “বহুজগত থিউরি ”।এই থিওরির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এতে Wave funtion collapse করতে হচ্ছে না। কে collapse করবে সেটা নিয়েও চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু…কিন্তু সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে,আমাদের অস্বস্তিকর জীবনযাপন। অস্বস্তির কারণ হচ্ছে, আমাদের এই থিউরি মেনে নিলে মেনে নিতে হবে যে, প্রতি পলে পলে নতুন নতুন জগত তৈরি হচ্ছে।


অবশেষে বিড়াল পরীক্ষণের সমাধান

আর এভাবেই শ্রোডিঞ্জারের এর চিন্তন বিড়াল পরীক্ষাটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে । অনেকে বেচারা বিড়ালের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য শ্রোডিঞ্জারের উপর রাগ করতে পারেন। বাস্তবে কিন্তু কোথাও এই এক্সপেরিমেন্ট ঘটেনি। এটা ছিল একটি “থট এক্সপেরিমেন্ট” বা “চিন্তা পরীক্ষা”। পুরো এক্সপেরিমেন্টটাই ছিল শ্রোডিঞ্জারের মাথার ভেতর।

তথ্যসূত্রঃ

১. কোয়ান্টাম ফিজিক্স- আবদুল গাফফার রনি ।

২. উইকিপিডিয়া। 



Author Image
Taohidur Rahman