বহুবাহক জ্যোতির্বিদ্যা: নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ থেকে বহুকিছু – দীপেন ভট্টাচার্য

বহুবাহক জ্যোতির্বিদ্যা: নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ থেকে বহুকিছু – দীপেন ভট্টাচার্য

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ যুগপৎ পর্যবেক্ষণ: ২০১৭ সনের ১৭ই অগাস্ট বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হিয়ে থাকবে। ঐ দিন জ্যোতিঃপদার্থবিদরা একটি উৎস থেকে প্রায় একই সময়ে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেন। এখানে উৎস মানে হল আকাশের কোনো একটি জায়গা। ঘটনাটি অগাস্ট মাসে ঘটলেও বিজ্ঞানীরা প্রায় দু মাস সময় নেন এটিকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য। ১৭ই অগাস্ট LIGO যন্ত্র দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ অবলোকনের ২ সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত ফের্মি দূরবিন একটি গামা রশ্মি বিস্ফোরণ আবিষ্কার করে (চিত্র ১)। LIGO ও ফের্মির যৌথ পর্যবেক্ষণ এই উৎসটির অবস্থান খুব সূক্ষ্ণভাবে নির্ধারণ না করতে পারলেও দৃশ্যমান তরঙ্গে সেটাকে খোঁজার জন্য আকাশের একটা এলাকা বেঁধে দেয় (যা কিনা ছিল পূর্ণচন্দ্রের আয়তন ক্ষেত্রের ১৫০ গুণ বড়)।

চিত্র ১: মধ্যের প্যানেলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের সময়টি দেখানো হয়েছে, সঙ্কেতটির মান এক টি বক্র রেখায় ওপরে উঠে গেছে। এর    ১.৭ সেকেন্ডের মধ্যেই ফের্মি যন্ত্র একটি গামা রশ্মি বিস্ফোরণ দেখতে পায় (ওপরের প্যানেল), সাথে সাথে INTEGRAL নামে আর একটি                                                                          গামা দূরবিনও অন্য তরঙ্গ দৈর্ঘে গামা বিস্ফোরণ দেখে।

দশ ঘন্টার মধ্যে চিলিতে বসানো কার্নেগী মানমন্দিরের ১ মিটার দূরবীনের চিত্রে এই উৎসটি ধরা পরে (চিত্র ২)। দেখা যায় এই ঘটনাটি ঘটেছে আমাদের মোটামুটি কাছাকাছি, ১৩০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, একটি সাধারণ উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিতে যার নাম হল NGC ৪৯৯৩।

চিত্র ২: চিলিতে ESO দূরবিন দিয়ে তোলা NGC ৪৯৯৩ গ্যালাক্সিতে কিলোনোভাটিকে তীর চিহ্ন দিয়ে দেখানো হচ্ছে।

বিভিন্ন তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গে আবিষ্কার: পরবর্তী কয়েক ঘন্টা ও কয়েক দিন ধরে ঐ উৎস থেকে দৃশ্যমান, অবলোহিত, এক্স রশ্মি ও বেতার তরঙ্গও নিরূপিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের একে অপরের চতুর্দিকে পরিক্রমা ও পরবর্তী সংঘর্ষ ও একত্রীভূত হবার প্রক্রিয়া থেকে এই মহাকর্ষীয় ও তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ উদ্ভূত হয়েছে। এই ধরণের ঘটনাকে কিলোনোভা নাম দেয়া হয়েছে। ২ নম্বর চিত্রে দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে ESOর একটি দূরবিন থেকে দৃশ্যমান তরঙ্গে তোলা ঐ সংঘর্ষের অবস্থানটি লাল তীর দিয়ে দেখানো হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ঐ তারাটি মিলিয়ে গেলেও এর সর্বোচ্চ জ্যোতিষ্মতা ছিল সূর্যের চেয়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি গুণ বেশী।

ভারি মৌলিক পদার্থের সংশ্লেষণ: দৃশ্যমান তরঙ্গে তারাটি দেখা দিয়েছিল প্রথমে নীল আলোতে, ধীরে ধীরে সেটা লাল হল। বিস্ফোরণের পরে দৃশ্যমান আলো ধূলায় আবরিত হয়ে যায় তখন অবলোহিত তরঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এই ধরণের সংঘর্ষে r- বা rapid প্রক্রিয়া মাধ্যমে ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হতে পারে। নিউট্রন নক্ষত্রের উপরিভাগে লোহা-জাতীয় ভারি মৌলিক পদার্থ থাকে, যদি সেগুলোর নিউক্লিয়াসে দ্রুত নিউট্রন সংযুক্ত করা যায় তাহলে পরবর্তীতে বেটা (বা ইলেকট্রন) অবক্ষয়ের মাধ্যমে আরো ভারি মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি করা সম্ভব। অবলোহিত তরঙ্গের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে এই সংঘর্ষে সোনা, প্লাটিনাম, নিওডাইমিয়াম, ইউরেনিয়ামের মত মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে (চিত্র ৩)। তাদের হিসাবে এই ঘটনায় যে পরিমাণ ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে সেটি পৃথিবীর ভরের তুলনায় প্রায় ১৬,০০০ গুণ বেশী। শুধু মাত্র সোনা ও প্লাটিনামের ভরই নাকি পৃথিবীর ভরের থেকে দশ গুণ বেশী। পৃথিবীতে, আমাদের শরীরে, যে সমস্ত ভারী মৌলিক পদার্থ আছে হয়তো তার এক অংশ এসেছে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে আর এক অংশ এসেছে নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ থেকে।

চিত্র ৩: কিলোনোভা থেকে অবলোহিত তরঙ্গের পর্যবেক্ষণ। মনে করা হচ্ছে এই বর্ণালীটি ভারী মৌলিক পদার্থের বিকিরণ দেখাচ্ছে। লাল তীর চিহ্ন  দিয়ে নিওডাইমিয়াম প্লাটিনাম ইত্যাদি মৌলিক পদার্থ থেকে বিকিরিত আলোকে দেখানো হচ্ছে। সূত্র : Kalsiwal et al. 2017, Science

বিজ্ঞানীরা মনে করেন সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঐ নিউট্রন নক্ষত্র দুটির সৃষ্টি যখন হয়েছে যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র ২ বিলিয়ন বছর। নিউট্রন নক্ষত্রের উপরিভাগের যে লোহা তা হয়তো সৃষ্টি হয়েছিল ঐ সুপারনোভা বিস্ফোরণে। এর ১২ বিলিয়ন বছর পরে তারা সৃষ্টি করল পর্যায় সারণীর অবশিষ্ট ভারী পদার্থগুলো।



কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ? আমার মতে যুগপৎ পর্যবেক্ষণের ফলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কার সম্পর্কে যে ন্যূনতম সংশয় ছিল তা দূর হয়ে গেল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের LIGO ও ইউরোপীয় VIRGO যন্ত্রের সাহায্যে পাঁচবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষিত হয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মডেল অনুযায়ী সেগুলোর সবকটিই ছিল দুটি বিশাল কৃষ্ণ বিবরের সংঘর্ষের ফলাফল। এই কৃষ্ণ বিবরগুলি সূর্যের ভর থেকে ২০, ৩০ কি ৪০ গুণ বেশী হতে পারে এবং তাদের সংঘর্ষের স্থান থেকে আমাদের কাছে সেই তরঙ্গের পৌঁছাতে কয়েশো কোটি বছর লেগেছে, অর্থাৎ যে গ্যালাক্সিগুলোতে ঐ ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো আমাদের থেকে অনেক দূরে। যেহেতু কৃষ্ণ বিবর নিতান্তই স্থান-কালের বক্রতা সেহেতু ঐ বিবরগুলোর সংঘর্ষ থেকে আমরা কোনো যুগপৎ তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ আশা করি না, কারণ সেজন্য বস্তুর উপস্থিতি দরকার। তাই ঐ পাঁচবার কোনো গামা রশ্মির বিস্ফোরণ অবলোকিত হয় নি। কিন্তু এবার একইসাথে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও গামা-রশ্মির (দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন-ধর্মী তরঙ্গ) পর্যবেক্ষণ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করল। এখানে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার আলোকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সম্পর্কে দু-একটা কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

স্থানকাল (অনেক বলেন দেশকাল) কী দিয়ে তৈরি? সেটা আমরা ঠিক জানি না, তবে এটুকু বলা যায় এটা এমন কিছু নয় যা কিনা ধরা ছোঁয়া যায়। অনেকে মনে করেন আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে মাধ্যাকর্ষণের ক্ষেত্রকে স্থানকালের জ্যামিতির সমান বলে গণ্য করেছেন। তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বা আলো এই স্থানকালে নিমজ্জিত এবং ভর দ্বারা নির্ধারিত স্থানকালের বক্রতাকে অনুসরণ করে ভ্রমণ করে। অন্যদিকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে স্থানকালের ‘চাদরটিরই’ ওঠানামা বলে ধরা যায়। একটি ত্বরণশীল আধানযুক্ত (চার্জযুক্ত) তড়িৎ কণা যেমন তড়িৎ-চুম্বকীয় (আলো) বিকিরণ করে, প্রায় একইভাবে একটি ভরের অসম গতি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে চারপাশের বস্তুসমূহকে দেখি, এই বিকিরণ ইলেকট্রনের মাধ্যমে বস্তুর সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া করে যার ফলে সেই বস্তু আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বস্তু বা ভরের সঙ্গে খুবই দুর্বলভাবে বিক্রিয়া করে তাই সেই তরঙ্গ অবলোকন করা দুরূহ। দুটি নিউট্রন নক্ষত্র যখন একে অপরের চারদিকে ঘোরে সেখান থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিকিরিত হয়ে, নিচে তারই একটি কল্পিত চিত্র দেখানো হচ্ছে।

দুটি নিউট্রন নক্ষত্র যখন একে অপরের চারদিকে ঘোরে সেখান থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিকিরিত হয়ে, তারই একটি কল্পিত চিত্র এখানে দেখানো       হচ্ছে। এখানে তরঙ্গের বিস্তার বা amplitudeকে অনেক বড় করে দেখানো হয়েছে, কার্যত সেটা খুবই ছোট। সুত্র: NASA

রৈখিক তরঙ্গ সমীকরণ: প্রায় একশো বছর আগে আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রণীত করেন। তাঁর এই মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব বেশ কয়েকটি অরৈখিক (non-linear) সমীকরণের সমষ্টি যেগুলোর সমাধান করা বেশ কঠিন। তত্ত্বটি অরৈখিক, অর্থাৎ সমীকরণগুলোর দুটি পৃথক সমাধানের সাধারণ যোগফল বা উপরিপাত (superposition) সমীকরণের সমাধান দেবে না। প্রকৃতিতে এর অর্থ হল দুটি বস্তুর সম্মিলিত মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তাদের পৃথক পৃথক ক্ষেত্রের সাধারণ যোগফল নয়। তাই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সমীকরণ থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সমাধান বার করা বেশ কঠিন। তবে দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের জন্য আইনস্টাইনের সমীকরণসমূহকে সরলীকরণ করে বা রৈখিক করে তরঙ্গ সমীকরণে রূপান্তর করা যায় যার সমাধান হল কিনা এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যা কিনা বক্র স্থানকালে (spacetime) আলোর গতিতে ভ্রমণ করে। যেহেতু মহাবিশ্বের বস্তুসমূহ এই স্থানকালের চাদরের ওপর অবস্থিত তাই স্থানকালের তরঙ্গে দুটি বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব পর্যায়ান্বিতভাবে বাড়ে ও কমে। এই তরঙ্গ সমাধানের আবার দুটি সমবর্তন (polarization) দশা আছে – ‘প্লাস’ ও ‘ক্রস’। নিচের চিত্রে সেটা দেখানো হল।


চিত্র ৪: স্থান ও বস্তুর ওপর প্লাস ও ক্রস সমাবর্তনীয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাব

তরঙ্গের বিস্তার ছোট: ওপরে আমি স্থানের যে সংকোচন ও বিস্তৃতির কথা লিখেছি সেটার পরিমাণ বা বিস্তার (amplitude) খুবই কম। এই বিস্তারের মান ১০^(-১৮) মিটার, একটি পারমাণবিক নিউক্লিয়াস এমন কি প্রোটনের আকৃতি থেকে ছোট। এই ধরণের অসম্ভব ছোট স্থানকালের বিস্তার নিরূপণ করতে গেলে সমস্ত ধরণের যান্ত্রিক কোলাহলকে মূল্যায়ণ করতে হবে ও মূল সংকেত থেকে বাদ দিতে হবে। আমরা এটাকে প্রেক্ষাপটের কোলাহল বলব যাকে ইংরেজীতে background noise বলা হয়। কী ধরণের কোলাহল? এর মধ্যে রয়েছে (ক) কোয়ান্টাম কোলাহল যেমন স্থানকালের বিস্তার মাপতে যে আলোর ব্যতিচার (interference) ব্যবহার করতে হয় সেই আলোক ফোটনের সময় নিরূপণের ও আয়নাতে ফোটনের কতখানি ভরবেগ স্থানান্তরিত হচ্ছে সেই সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, (খ) আয়নার ওপরের আবরণ (coating) ও বিভিন্ন যন্ত্রকে ঝুলিয়ে রাখার জন্য ক্যাবল থেকে তাপীয় বিকিরণ (যে কোনো বস্তুই তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ করে, এই বিকিরণের পরিমাণ সে বস্তুর তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে), (গ) ভূগর্ভের মাটির ঘনত্ব পরিবর্তনের কারণে ও দূরবর্তী চলন্ত গাড়ির প্রভাবে মাধ্যকর্ষণ ক্ষেত্রের হেরফের, (ঘ) বায়ুচাপের পরিবর্তন, ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা বলছেন আমাদের থেকে নিকটবর্তী তারা আলফা সেণ্টাউরি যে দূরে অবস্থিত ঐটুকু দূরত্বে এই স্থান বদলেছে মাত্রা একটি চুলের প্রস্থের সমান।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গঠন নির্ধারণ: দুটি কৃষ্ণ বিবর বা দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের পারস্পরিক পরিক্রমা ও পরবর্তী সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গঠন ঠিক কী হবে সেটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে গত ২০ বছর। আগেই বলেছি কোনো বস্তুর অসমান চলন থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎপত্তি হতে পারে। দুটি খুব ভারি বস্তু যখন একে অপরের চারদিকে ঘুরতে থাকে তখন এই চলনকে অসম বলা যেতে পারে। ভারি বস্তুদুটি যখন একে অপর থেকে দূরে থাকে তখন তাদের থেকে বিকিরিত তরঙ্গকে ওপরে বর্ণীত আইনস্টাইন সমীকরণের রৈখিক সমাধান মাধ্যমে মডেল করা চলে, কিন্তু সেই বস্তুদুটি যখন খুব কাছাকাছি আসে ও যখন তাদের সংঘর্ষ হয় তখন সেই তরঙ্গকে মডেল করতে হলে শুধুমাত্র রৈখিক সমাধানে কাজ হবে না, তখন সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া কম্পুটারে নম্বর দিয়ে গণনা করতে হবে। শুধুমাত্র ২০০৫ সালের পরই বিজ্ঞানীরা এই দুরূহ গণনাকে আয়ত্ত করতে পারেন।

৫ নম্বর চিত্রে এ বছরের ১৪ই অগাস্ট বিজ্ঞানীরা দুটি কৃষ্ণ বিবরের সংঘর্ষ থেকে বিকিরিত যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অবলোকন করেন তার ফলাফল দেখানো হল (এটি ১৭ই অগাস্টের কিলোনোভা ঘটনা থেকে ভিন্ন)। ঐ চিত্রের নিচের প্যানেলে LIGO ও VIRGO যন্ত্রের প্রাপ্ত তরঙ্গের ওপরে কম্পুটারে গণনায় তরঙ্গের গঠনকে একই সাথে দেখানো হয়েছে। ঐ গঠন থেকেই কৃষ্ণ বিবরের ভর, দূরত্ব, তাদের কক্ষপথের বিভিন্ন মান নির্ধারণ করা যায়। মাঝখানের প্যানেলটিতে দেখানো হয়েছে বিবরদুটি একে অপরকে যখন সেকেন্ডে ৩০ বার থেকে ২৫০ বার মত প্রদক্ষিণ করে শুধুমাত্র তখনই মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে LIGO ও VIRGO যন্ত্রে নিরূপণ করা গেছে।


চিত্র ৫: ১৪ই অগাস্টের মহাকর্ষীয় তরঙ্গটি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন নিরূপক যন্ত্রে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন একটি ৩১ সৌরীয় ভর ও আর একটি  ২৫ সৌরীয় ভরসম্পন্ন কৃষ্ণ বিবরের সংঘর্ষে এই তরঙ্গের উৎপত্তি। এই আবিষ্কারের তিনদিন পরে দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের মাধ্যমে সৃষ্ট          মহাকর্ষীয় তরঙ্গ LIGO যন্ত্রে ধরা পড়ে।

এরকম কিলোনোভা বিস্ফোরণ কি প্রায়শই হয়? এবার আসি ১৭ই অগাস্টের কিলোনোভা ঘটনায় যেখানে দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানতেন যে মহাবিশ্বে অনেক জোড়া নিউট্রন নক্ষত্র আছে। ১৯৭০ এর দশকে তাঁরা আমাদের গ্যালাক্সিতে এরকম একটি জোড়া নিউট্রন নক্ষত্র (যারা পালসারও বটে) আবিষ্কার করেছিলেন যে দুটি একে অপরের চারদিকে ঘুরছে এবং ক্রমাগত তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ ও মহাকর্ষীয় বিকিরণের মাধ্যমে শক্তি ক্ষরণ করে একে অপরের কাছে আসছে। মহাকর্ষ তরঙ্গ যে আছে এটা হল তার পরোক্ষ প্রমাণ, এর জন্য জোড়া তারাটির আবিষ্কারক হালস ও টেইলার নোবেল পুরষ্কার পান। তবে এই হালস ও টেইলরের পালসার দুটি একে অপরের থেকে প্রায় দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে ছিল। এটা খুব একটা দূরত্ব নয়, চাঁদ পৃথিবী থেকে ৩ লক্ষ কিলোমিটার মত দূরত্বে অবস্থিত, কাজেই এটা চাঁদের দূরত্বের পাঁচগুণ, তবে এদের সংঘর্ষ আগামী ৩০০ মিলিয়ন বছরে হবে না। অন্যদিকে কিলোনোভা নিউট্রন নক্ষত্রদুটির মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যখন LIGO দেখতে পায় সেদুটি একে অপর থেকে মাত্র ৩২০ কিলোমিটার দূরে ছিল, এবং এর পরে ১০০ সেকেন্ড লাগে তাদের একত্রীভূত হয়। নিরূপণের শুরুতে তারা দুটি একে অপরকে সেকেন্ডে ২৪ বার প্রদক্ষিণ করছিল, সংঘর্ষের আগে সেটি সেকেন্ডে প্রায় ৩০০ বার হয়ে দাঁড়াল (চিত্র ৬)। কিলোনোভা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আমাদের গ্যালাক্সিতে এরকম জোড়া নিউট্রন সংঘর্ষ প্রতি দশ হাজার বছরে একটি হয়।

চিত্র ৬: ১৭ই অগাস্টের মহাকর্ষীয় তরঙ্গটি LIGOর দুটি নিরূপক যন্ত্রে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন একটি ১.৩৬ সৌরীয়   ভর ও আর একটি ১.১৭ সৌরীয় ভরসম্পন্ন নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে এই তরঙ্গের উৎপত্তি। যদিও এখানে শেষ ৩০ সেকেন্ডের ফলাফল দেখানো হচ্ছে LIGO সংঘর্ষের ১০০ সেকেন্ড পূর্ব থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ দেখতে পায় যখন নক্ষত্রদুটি একে অপরকে                                                                                          সেকেন্ডে ২৪ বার প্রদক্ষিণ করছিল।

স্বল্পস্থায়িত্বের গামা বিস্ফোরণ: LIGO যন্ত্রে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ার ১.৭ সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা ফের্মি দূরবিন একটি স্বল্পস্থায়িত্বের (২ সেকেন্ড) গামা বিস্ফোরণ অবলোকন করে। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন স্বল্পস্থায়িত্বের গামা বিস্ফোরণ দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়। LIGO যন্ত্রের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মডেল নির্ধারণ করল যে এই ঘটনাট ঘটেছে দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে। দুটি পর্যবেক্ষণই মিলে গেল। তবে এত কাছের একটি গ্যালাক্সি থেকে গামা বিস্ফোরণের উজ্জ্বলতা আরো বেশী হবার কথা ছিল। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন এরকম সংঘর্ষের পরে গামা রশ্মির যে জেট তৈরি হয় সেটাকে আমরা যদি মুখোমুখি না দেখি তবে বিস্ফোরণের মাত্রা কম হতে পারে। তাঁরা এই কিলোনোভার একটি মডেল তৈরি করেছেন, ৭ নম্বর চিত্রে সেটা দাখানো হল। সংঘর্ষের পরে গামা জেটটির কিছু সময় লেগেছে ধ্বংসাবশেষকে ফুঁড়ে বের হতে, সেজন্য আমরা তাকে ১.৭ সেকেন্ড পরে দেখতে পাই। মনে করা হয় আমরা যদি একটি জেটকে মুখোমুখি দেখতাম তাহলে গামা বিস্ফোরণের পুরো মাত্রাটা ধরা পড়ত। এই গ্যালাক্সিটি আমাদের কাছে হবার জন্যই জেটের পাশ থেকেও আমরা গামা রশ্মি ধরতে পারলাম।


চিত্র ৭: সংঘর্ষের পরে কিলোনোভাটির মডেল। গামা-রশ্মির জেটটি আমাদের চোখ বরাবর নয়। Kalsiwal et al. 2017, Science

বহুবাহক জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা: এই আবিষ্কার বেশ কয়েকটি ভাবিকথনকে প্রমাণ করল। (১) দুটি নিউট্রন নক্ষত্র একে অপরকে প্রদক্ষিণ করলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, (২) দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে যে উচ্চশক্তিসম্পন্ন জেট তৈরি হয় যেখান থেকে অল্প সময়ের জন্য গামা রশ্মি সৃষ্টি হয়, (৩) এই সংঘর্ষে ভারী মৌলিক পদার্থ যেমন সোনা, প্লাটিনাম ও ইউরেনিয়ামের মত পদার্থের সৃষ্টি হয়, এবং (৪) ১৩০ মিলিয়ন (১৩ কোটি) আলোকবর্ষ দূর থেকে আলো ও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একে অপরের ২ সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীতে পৌঁছেছে, এর মানে হল মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ একই গতিতে ভ্রমণ করে যেটা কিনা আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বেরই একটি অনুষঙ্গ। এইভাবে শুরু হল বহুবাহক (multimessenger) জ্যোতির্বিদ্যার সূচনা যেখানে যুগপৎভাবে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও মহাজাগতিক কণা (cosmic ray) পর্যেব্ক্ষণ করা হয়। এই নতুন বিজ্ঞানে জ্যোতি:পদার্থবিদ্যা ও মহাজাগতিকবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হল পারমাণবিক নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান।

চিত্র ৮: আকাশ থেকে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার LIGO যন্ত্রটি

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপণ প্রক্রিয়া: দুটি লম্ব বাহুর মধ্যে ব্যতিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঐ বাহুদুটির সামান্য পরিবর্তন LIGO যন্ত্র ধরতে পারে। দুটি LIGO যন্ত্রের একটি লুইজিয়ানায় ও আর একটি ৪০০০ কিলোমিটার দূরে ওয়াশিংটন স্টেটে অবস্থিত। এদের ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘের বাহুদুটি একে অপরের সাথে লম্বভাবে অবস্থিত (চিত্র ৮)। LIGOতে একটি লেজার রশ্মিকে একটি আধা-স্বচ্ছ কাচের মধ্যে দিয়ে দুটি লম্ব অংশে ভাগ করা হয় এবং রশ্মিদুটি ঐ বাহুদুটিতে ভ্রমণ করে। এই রশ্মিদুটিকে আবার পুনরায় মিলিত করা হয় যখন তারা বাহুদুটির শেষে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। যদি দুটি বাহুই একই দৈর্ঘের হয় তবে তরঙ্গদুটির শীর্ষদুটি (অথবা সবচেয়ে নিচু অংশদুটি) একে অপরের ওপর পতিত হয়ে গঠনমূলক ব্যতিচার করবে – অর্থাৎ তাদের মিলিত ফল আরো উঁচু হবে (অথবা আরো নিচু হবে)। আলোকে বিচ্ছুরণ থেকে মুক্ত রাখতে ও তার গতিকে এক রাখতে ঐ বাহুগুলির টিউবের মধ্যে ভ্যাকুম অবস্থা বজায় রাখা হয়। যদিও প্রতিটি বাহু মাত্র ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘের, ফাব্রি-পেরো (Fabri-Perot) পদ্ধতিতে ২৮০ বার (বা আরো বেশী) পুনঃপ্রতিফলনের ফলে কার্যত এক একটি বাহুর দৈর্ঘ ১১২০ কিলোমিটার (বা তার থেকেও বেশী) হতে পারে। এর ফলে যে ব্যতিচার হয় সেটা দিয়ে দুটি বাহুর মধ্যে দৈর্ঘের পার্থক্য একটি প্রটোনের ব্যাসের ১/১০০০ বা ১/১০,০০০ ভাগ হলেও সেটা ধরা যেতে পারে।

চিত্র ৯: LIGO যন্ত্রে ব্যতিচার সংঘটনের প্রক্রিয়া

কিন্তু আলোক তরঙ্গ নিজেই কি স্থান-কালের বিচ্যুতির অধীন নয়? প্রশ্ন উঠতে পারে আলোক তরঙ্গকে ব্যতিচারের জন্য কী করে ব্যবহার করা সম্ভব যদি তাদের নিজেদেরই তরঙ্গ দৈর্ঘের সঙ্কোচন বা বৃদ্ধি হয়। আসলেই আলোকতরঙ্গকে ব্যবহার করা যেত না যদি লম্ব বাহুদুটির প্রতিটি একইভাবে বাড়ত কিংবা সংকুচিত হত। কিন্তু আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে সমবর্তনের ফলে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ একদিকে দেশকালের দৈর্ঘা যেমন বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে (অর্থাৎ লম্বদিকে) তেমনভাবেই সংকোচন করে (চিত্র ৪)। এর ফলাফলটা দুটো ছবি দিয়ে বোঝানো সম্ভব।



১০ নম্বর চিত্রে আমরা দেখিয়েছি দুটি লম্ব বাহুতে দুটি তরঙ্গ যখন কোনো মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নেই। দেখাই যাচ্ছে যে এখানে দুটি তরঙ্গের দশা (phase) একই এবং এদের মিলিত করলে আমর গঠনমূলক ব্যতিচার পাব।

চিত্র ১০: দুটি বাহুতে আলোকতরঙ্গ যখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নেই, অর্থাৎ দেশকালের বিচ্যুতি অনুপস্থিত।

এবার মনে করা যাক মহাকর্ষীয় তরঙ্গের জন্য স্থানকালের বিচ্যুতি হচ্ছে। আমরা আগেই বলেছি এর ফলে স্থান একদিকে সংকুচিত হয়, অন্যদিকে বর্ধিত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে পুরো বাহুটার দৈর্ঘের হেরফের হয় এবং যেহেতু আলো স্থানকালে নিমজ্জিত সেহেতু তারও তরঙ্গদৈর্ঘের হেরফের হবে। ১১ নম্বর চিত্রের ওপরের প্যানেলে আমরা দেখাচ্ছি একটি বাহুর প্রসারণ ঘটছে যার ফলে সেই বহুতে চলমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ বেড়েছে, অন্যদিকে লম্ব বাহুটির সংকোচনের ফলে সেই বাহুর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ প্রথম বাহুটির তুলনায় কমবে। দেখাই যাচ্ছে যে এই দুটি তরঙ্গকে যখন মেলানো হবে তখন তাদের দশা এক হবে না এবং তাদের গঠনমূলক ব্যতিচার হবে না, অর্থাৎ একটি তরঙ্গের শীর্ষ অন্য তরঙ্গের শীর্ষের সঙ্গে মিলবে না। একটি শীর্ষের আগমন সময় অন্য শীর্ষের আগমন সময় থেকে ভিন্ন হবে। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্য ছবিতে আমরা এই প্রক্রিয়াটাকে বাড়িয়ে দেখিয়েছি।

চিত্র ১১: মহাকর্ষীয় তরঙ্গের জন্য দেশকালের বিচ্যুতির ফলে দুটি বাহুতে আলোকতরঙ্গের দশার পার্থক্য।

সঙ্কুচিত আলো (squeezed light): LIGO যন্ত্রে বিজ্ঞানীরা খুবই চমকপ্রদ একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে চাইছেন যা কিনা প্রকৃতিতে উপস্থিত কোয়ান্টাম ভ্যাকুম বিচলনের প্রভাবকে এড়াতে পারবে। একে সঙ্কুচিত (squeezed) আলো বলা যেতে পারে। আমরা জানি শূন্যতার মধ্যেও ক্রমাগতই কণা সৃষ্টি হয় যাদের অস্তিত্ব নিরূপণের আগেই তারা প্রতিকণার সঙ্গে মিলিত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু ঐ স্বল্পসময়ের অস্তিত্বে তারা LIGOর আয়নার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা লেজারের এমন আলো তৈরি করছেন যার ফলে ঐ ধরণের প্রভাব থেকে এই এক্সপেরিমেন্টকে মুক্ত করা যেতে পারে। এর ফলে শূন্যস্থানে যে ফলাফল পাওয়া যাবে LIGOর ফলাফল তার থেকেও ভাল হবে। কিন্তু এই জটিল আলোচনাটি ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিয়ে আপাততঃ এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কাহিনীর সমাপ্তি টানছি।



Author Image
Faysal Nadim