নিউটনের মহাকর্ষ – পর্ব-২

নিউটনের মহাকর্ষ – পর্ব-২



নিউটন মহাকর্ষ বলের জন্য একটা সূত্র দিলেন। সেটা হলো, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান তত বেশি হবে যত বস্তুদুটোর ভর বেশি হবে। যেকোনো একটার ভর বাড়লেও মহাকর্ষ বলের মান বাড়ে। কিন্তু বস্তু দুটোর মধ্যে দূত্ব যত বাড়ে তাদের মধ্যে মহাকর্ষীয় টান তত কমে। এই কমা আবার সহজ-সরল ভাবে কমা নয়, বর্গাকারে। অর্থাৎ দূরত্ব যদি বেড়ে দ্বিগুণ হয় তবে মহকর্ষ বলের মান কমে আগের মানের এক চতুর্থাংশে নেমে আসবে।পৃথিবীতে আমরা হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছি, কোনও বস্তু ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে মূহশূন্যে চলে যাচ্ছ না, এর কারণও ওই মহাকর্ষ বল। নিউটন দেখালেন মহাকর্ষ বল শুধু আকর্ষণই করে, বিকর্ষণ করে না কখনও।এখন প্রশ্ন হলো মহাকর্ষ বলের সীমা কত?
এমনিতে মহাকর্ষ বলের সীমা অসীম। কিন্তু মহাবিশ্বের অন্য তিন প্রকার বল, সবল নিউক্লিয়, দুর্বল নিউক্লিয় ও বিদুৎচ্চুম্বকীয় বলের তুলনায় এই বল অনেক কম। তারমানে, মহকর্ষ বলের প্রভাব যতদূর পর্যন্তই ছড়িয়ে থাক, এ নিতান্তই দুর্বল আকর্ষণী বল। পৃথিবীর কথাই ধরা যাক। এর মহাকর্ষ বলের সীমা অসীম। কিন্তু বস্তুকে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়তে হলে সেই বস্তুকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের থাকতে হবে। এই দূরত্বের বাইরের বস্তুকে পৃথিবী তাঁর নিজের বুকে টেনে নিতে পারবে না। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সেই দূরত্ব পর্যন্ত পৃথিবীর চারপাশের এলাকাকে মহাকর্ষ ক্ষেত্র বলে।বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে তাঁর মহাকর্ষ ক্ষেত্র কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। যেমন সূর্যের এই মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সীমা পৃথিবী থেকে অনেক বেশি। আবার বুধ গ্রহের মহাকর্ষ সীমা পৃথিবীর থেকে অনেক কম।
আবার আরেকটা কথাও সত্যি। এই মহকর্ষ ক্ষেত্রের ভেতর থেকে কোনো হালকা বা গতিশীল বস্তুও বেরিয়ে যেতে পারে না। যেমন পারে নাবায়ুমণ্ডলের কথা। বায়ুমণ্ডলর উপদান গ্যাসীয় পদার্থগুলো পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের বাইরে যেতে পারে না। কারণ, গ্যাসের প্রতিটা পরমাণুকে পৃথিবী মহাকর্ষ বল দ্বারা নিজের দিকে টানছে।এখানে একটা প্রশ্ন হতে পারে, মহাকর্ষ বলই যদি গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণু বা অণুগুলোকে আকর্ষণ করে রাখে তবে তাদের কেন এত ওপরে ওঠার প্রবণতা?একটা কথা বোধহয় কারো অজনা নয়, কঠিন পদার্থের ভেতর অণু-পরামণুগুলো বেশ শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধনের কারণে গায়ে গায়ে লেগে থাকে। তাই কঠিন পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে না। তাই নিতান্ত ভঙ্গুর না হলে একটা হালকা কঠিন পদার্থের ওপর তুলানামুলক ভারী কোনো কঠিন পদার্থ রাখলেও খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু তরল পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো অনেকটা মুক্তভাবে থাকে। অনেকগুলো তরল পদার্থ একটা পাত্রে যখন রাখা হবে, তখন একটা হিসাব নিশ্চিতভাবে এসে যাবে– কে ওপরে থাকবে আর কে নিচে থাকবে। এখানেও এদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় মহাকর্ষ বল। যে তরলের ঘণত্ব বেশি তার ওপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব বেশি থাকবে। তাই তুলনামূলক ভারী তরলটা মাহাকর্ষ টানের ফলে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকতে চাইবে। অন্যদিকে হালকা তরলের ওপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব তুলনামূলক কম হওয়ায় সে ভারী তরলকে নিচের দিকে জায়গা ছেড়ে দেবে আর নিজে উঠে যাবে ওপরে। এক বালতি পানির ভেতর কিছু মধু ঢেলে দেখলেই এ ব্যাপারটার সত্যতা মিলবে।



ঠিক ওপরের মতোই ঘটনা ঘটে গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থে। গ্যাসীয় পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো বলতে গেলে প্রায় মুক্তভাবে থাকে। সুতরাং এদের ওপর মহাকর্ষ বলের প্রভাবও থাকে অনে কম। তবুও তো থাকে। আমাদের গোটা বায়ুমণ্ডলটাকে বলা যায় গ্যাসীয় পদার্থের সমুদ্র। সব গ্যাসের ঘনত্ব যেমন সমান নয়, তেমনি সব গ্যাসের পরমাণু সমান ভারী নয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারী ও বেশি ঘনত্বের গ্যাসগুলো ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকে। হালকা গ্যাসগুলো উঠে যায় ওপরের দিকে।এখানে আরেকটা প্রশ্ন আসতে পারে, বায়ুমণ্ডলের স্তর যেখানে শেষ, অন্যবস্তুকে নিজের বুকে টেনে আনার ক্ষমতার সীমাও কি সেখানে শেষ ?
না, সেখানে নয়। আমাদের পৃথিবীতে মোট যে গ্যাসীয় পদার্থের পরিমাণ তা দিয়ে মহাকর্ষ সীমার পুরোটাই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই বায়ুমণ্ডলীয় সীমার বাইরেও মহাকর্ষ ক্ষেত্র রয়েছে। বায়ুর ছড়িয়ে যাওয়া বৈশিষ্ট্যের কথা ভাবলে এই প্রশ্নটা মাথায় এসে যেতে পারে। এ কথা ঠিক, গ্যাসের পরিমাণ যাই হোক, তাকে যখন যে পাত্রে রাখা হয়, তার সবটুক আয়তন ওই গ্যাস দখল করে। কিন্তু মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে এমন গ্যাস পাত্র হিসেবে ধরলে চলবে না, কারণ গ্যাস পুরো ক্ষেত্রে ছড়িয়ে যেতে চাইলেও মহাকর্ষ বলের টান তা হতে দেয় না।ইচ্ছে করলেই কি কেউ মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সীমা পেরিয়ে যেতে পারবে?
অনেক পুরোনো প্রশ্ন। এখন এ বিষয়টা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। চাইলেই মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সীমা পেরুনো যায় না। তবে একটা শর্ত পূরণ করতে পারলে সেটা অসম্ভবও নয়। তার প্রমাণ মহশূন্য যান আর স্যাটেলাইটগুলো। অবশ্য এগুলো উৎক্ষেপন করা হয় রকেটের সাহায্যে। আসলে এই রকেটের ভেতরেই রয়েছে মহাকর্ষ ক্ষেত্র ছাড়িয়ে যাওয়ার দাওয়ায়। কোনো মহাকর্ষ ক্ষেত্র পেরুতে হলে একটা নির্দিষ্ট বেগে ছুটতে হবে। এই বেগকে মুক্তিবেগ বলে। মুক্তিবেগের মান সেকেন্ডে ১১.২ কিলোমিটার। রকেট উৎক্ষেপনের সময় তার গতিবেগ থাকে সেকেন্ডে ১১.২ কিলোমিটারের বেশি। পাঠক, এই মুক্তিবেগের বিষয়টা মনে রাখুন, পরে দরকার হবে এটা।



লেখকঃ আবদুল গাফফার রনি

Author Image
Faysal Nadim