মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়ঃ ব্ল্যাকহোল

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়ঃ ব্ল্যাকহোল




মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় কালো গর্ত ? না ঠিক তা না। মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়  হল কৃষ্ণবিবর বা কৃষ্ণ গহ্বর । ব্ল্যাকহোল এর শাব্দিক অর্থ  কালো গর্ত কিন্তু ব্যাবহারিক বা আভিধানিক অর্থ হল কৃষ্ণবিবর বা কৃষ্ণ গহ্বর

মহাকাশের এক অনন্ত সীমা পরিসীমা বিহীন বিস্ময় এই ব্ল্যাকহোল। আইন্সটাইন এর জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি অনুসারে, কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল মহাকাশের এমন একটি বিশেষ স্থান যেখান থেকে কোন কিছু, এমনকি মহাবিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন আলো পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারে না। আলোকতরঙ্গ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয়।

ব্ল্যাকহোল কী ? 

মহাবিশ্বের এমন কিছু তারকা বা নক্ষত্র আছে, যারা এমন শক্তিশালী মহাকর্ষ বল তৈরি করে যে এটি তার কাছাকাছি চলে আসা যেকোন বস্তুকে তার দিকে একেবারে টেনে নিয়ে যায়, হোক তা কোন নক্ষত্র, গ্রহ, ধুমকেতু ,গ্রহাণুপুঞ্জ  তা-ই ব্ল্যাক হোল। ১৯৬৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার  সর্বপ্রথম এর নাম দেন ব্ল্যাক হোল”। যদিও এই চিন্তা ধারার বয়স বস্তুত ২০০ বছর। ঐ সময় আলো সম্পর্কে দুই ধরনের তত্ত প্রচলিত ছিল- একটি আলোর তরঙ্গতত্ত অপরটি কণা তত্ত ।  তরঙ্গতত্ত অনুযায়ী আলো তরঙ্গ দিয়ে গঠিত আর কনা তত্ত অনুযায়ী আলো কণা দিয়ে গঠিত । দুই তত্তই সঠিক-আলো কণা ও তরঙ্গ উভয়ে । এখন , আলো তরঙ্গরুপি হলে তা মহাকর্ষ বল দ্বারা আকৃষ্ট হয় কি না তা স্পষ্ট ছিল না কিন্তু কনারুপি হলে আলো অবশ্যই মহাকর্ষ বল দ্বারা আকৃষ্ট হবে। আগে মনে করা হত যে, আলোর বেগ অসীম কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল যে, আলোর বেগের একটি সীমা আছে ।



কেম্ব্রিজ বিশ্ব বিদ্দালয়ের অধ্যাপক জন মিচেল  ১৮৮৩ সালে বলেন যে,  একটি তারকায় যদি যথেষ্ট ভর ও ঘনত্ব থাকে তাহলে তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এত শক্তিশালি হবে যে সেখান থেকে আলো বের হতে পারবেনা । এরকম বহু তারকা রয়েছে বলে ধারনা করেছিলেন তিনি ।

ঐ সব তারকা থেকে আলো আসতে পারে না বলে আমরা তাদের দেখতে পাইনা , তবে তাদের মহাকর্ষ আমাদের বোধগম্য হয়।এই সমস্ত বস্তু কে বলা হয় কৃষ্ণবিবর বা কৃষ্ণ গহ্বর বা ব্ল্যাক হোল।

এই  নক্ষত্রদের অনিয়ত ও অস্বাভাবিক আকার, ভর,শক্তি , ঘনত্ব থাকার জন্যে এই সব তারকা থেকে নির্গত আলো বাইরে আসতে পারে না। অর্থাৎ যখন একটি তারকার জীবনকাল শেষ হয়ে যায়, সেই মুহূর্তে তার অভিকর্ষ শক্তি এতই প্রবল হয় যে আলো ওখান থেকে বের হতে পারে না। আর এই ঘটনা তখনই ঘটে যখন একটি তারকার জীবনকাল অর্থাৎ তার নির্দিষ্ট জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। তখন  তারকাটি পরিণত হয় ব্ল্যাকহোলে। এভাবেই একটি ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয়।

ব্ল্যাকহোল এর সৃষ্টি 

একটি তারকার মৃত্যু থেকে জন্ম নেয় একটি কৃষ্ণগহ্বর। বিজ্ঞানীদের মতে সব চেয়ে ছোট ব্ল্যাকহোলটির জন্ম ঠিক এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়। একটি নক্ষত্রের নির্দিষ্ট জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে গেলে এর মৃত্যু ঘটে। যতক্ষণ পর্যন্ত এর অভ্যন্তরীণ হাইড্রোজেন গ্যাস বা হিলিয়াম গ্যাস অবশিষ্ট থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর ভিতরে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া চলতে থাকে। হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম শেষ হয়ে গেলে এর কেন্দ্রীয় মূলবস্তু সংকুচিত হতে থাকে। এভাবে একটি  তারকার মৃত্যু হয়।

নক্ষত্রের ভরের উপর কৃষ্ণগহ্বর এর সৃষ্টি অনেকাংশে নির্ভর করে- যেমন-

নক্ষত্রের ভর ১.৪ সৌর ভরের কম হলেঃ

এই অবস্থায় নক্ষত্র টি যখন সংকুচিত হতে হতে এমন ধাপে পৌঁছে যখন এটি এর বহিস্থ আবরণ কে ছুড়ে দেয়। ফলে প্রচুর শক্তি নির্গত হয় তখন তারকাকে নোভা স্টার বলে। উক্ত বিস্ফোরণে যা অবশিষ্ট থাকে তাকে শ্বেত বামন নক্ষত্র বলে। যদি কোন নক্ষত্রের ভর ১.৪ সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয় তবে তা শ্বেত বামন নক্ষত্র হতে পারবে না।নক্ষত্রের এই ভরকে চন্দ্র শেখর সীমা বলে । কোন নক্ষতের ভর  চন্দ্র শেখর সীমার চেয়ে বেশি হলে তা নিউট্রন নক্ষত্র বা ব্ল্যাকহোলে পরিনত হবে ।নক্ষত্রের ভর ১.৪ সৌর ভরের চেয়ে বেশি হলেও তা কোয়ার্ক বা ব্ল্যাকহোলে পরিনত হবে

ব্ল্যাকহোলে রয়েছে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র। প্রত্যেক ব্ল্যাকহোলের চারদিকে একটি সীমা আছে যেখানে একবার ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না, সম্ভব হয় না । ব্ল্যাকহোলের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, অভিকর্ষজ ত্বরণ এর মানও অনেক যার কারনে ফোটন কাছে গেলেও হারিয়ে যায়।



ব্ল্যাক হোল এর ইতিহাস ঃ

ব্ল্যাকহোল হলো বিপুল পরিমাণ ভর বিশিষ্ট কোন বস্তু, যার মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে আলোক তরঙ্গ পর্যন্ত পালাতে পারে না- এ ধারণা সর্বপ্রথম প্রদান করেন ভূতত্ত্ববিদ জন মিচেল (John Michell)। ১৭৯৬ সালে গণিতবিদ পিয়েরে সিমন ল্যাপলেস একই মতবাদ প্রদান করেন তাঁর ‘Exposition du systeme du Monde‘ বইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে।

১৯১৬ সালে আইনস্টাইন তার জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্ব  দিয়ে ধারনা করেন যে ব্ল্যাকহোল থাকা সম্ভব। আর ১৯৯৪ সালে এসে নভোচারীরা প্রমাণ করেন আসলেই ব্ল্যাকহোল আছে।জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জস্কাইল্ড ১৯১৬ সালেই দেখান, যেকোন তারকা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে।

                              ডার্ক ম্যাটার

ব্ল্যাকহোল ও ডার্ক ম্যাটার কি একই জিনিস ?

না । ব্ল্যাকহোল ও ডার্ক ম্যাটার এক জিনিস না হলেও সমতুল্য বলা যেতে পারে ।

ডার্ক ম্যাটার কি ?

ডার্ক ম্যাটার হচ্ছে সেই ধরনের পদার্থ, যেটা আসলে যে কী ধরনের  পদার্থ সে সম্পর্কে আমরা এখন পর্যন্ত কিছুই জানি না । ডার্ক ম্যাটার এক আশ্চর্যকর বস্তু যা আলো শোষণও করে না প্রতিফলনও করে না । ফলে একে দেখাও যায় না। কেবল আলো নয়, আমাদের যে কোন তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের সাথেও সে একই রকম আচরণ করে।ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরী তা এখনও বের করা না গেলেও এইটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে আমাদের পরিচিত কোনকিছুর সাথে এর কোন মিল নেই । র্ক ম্যাটারের একটা বৈশিষ্ট্য জানা গেছে, তা হল তার মহাকর্ষ বলের সাথে সম্পর্ক রয়েছে, এবং এই মহাকর্ষ বল গ্যলাক্সি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বিপুল পরিমাণ ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব না থাকলে গ্যালাক্সিগুলোর আকার যাকে বলে একেবারে “ছেড়াবেড়া” হয়ে যেত!
তাই, ব্ল্যাক হোল ও ডার্ক ম্যাটার এক জিনিস নয়।



কতো বড় এই ব্ল্যাকহোল ?

ব্ল্যাকহোল ছোট হতে পারে আবার বড়ও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে ক্ষুদ্রতম ব্ল্যাকহোল একটি পরমাণুর সমান হতে পারে। এই জাতীয় ব্ল্যাকহোলগুলো অনেক ক্ষুদ্র কিন্তু তাদের এক একটার ভর হতে পারে বিশাল কোন পর্বতের সমান। অন্য এক ধরনের ব্ল্যাকহোলকে বলা হয়“স্টেলার” বা “নাক্ষত্রিক”। এর ভর আমাদের সূর্যের ভর এর চেয়েও ২০ গুণ বেশি হতে পারে।

খুব সম্ভবত অনেক অনেক বেশি ভরেরও নক্ষত্র রয়েছে পৃথিবীর ছায়াপথে। আর পৃথিবীর এই ছায়াপথকে বলা হয় “মিল্কিওয়ে”। সবচেয়ে বৃহৎ ব্ল্যাকহোলকে বলা হয় “সুপারমেসিভ”। কৃষ্ণবিবরকে ভাগ করা হয় তার মাঝে থাকা ভর, আধান, কৌণিক ভরবেগের উপর ভিত্তি করে। ভরের উপর ভিত্তি করে কৃষ্ণবিবর চার ধরনের। যেমন-

১. Super Massive Blackhole (সুপার মেসিভ ব্ল্যাকহোল)

২. Intermediate Blackhole (ইন্টারমিডিয়েট ব্ল্যাকহোল)

৩. Micro Blackhole (মাইক্রো ব্ল্যাকহোল)

৪. Steller Blackhole (স্টেলার ব্ল্যাকহোল)

ব্ল্যাক হোল যদি ব্ল্যাক অর্থাৎ কালো হয়, তাহলে বিজ্ঞানীরা কিভাবে তা দেখতে পান ?

সাধারণভাবে, একটি ব্ল্যাকহোলকে দেখা প্রায় অসম্ভব। কারণ এর অতি শক্তিশালী অভিকর্ষীয় শক্তির সবটুকু আলোর কেন্দ্রের দিকে টানে। কিন্তু এর আশেপাশের তারকা এবং গ্যাস কীভাবে এর দ্বারা প্রভাবিত হয় বা হচ্ছে বিজ্ঞানীরা এটা দেখতে পারেন। যেসব তারকারা ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে উড্ডয়মান অথবা ঘূর্ণায়মান, গবেষকরা সেই সব তারকাদের উপর গবেষণা করতে পারেন।

ব্ল্যাক হোল বনাম বিজ্ঞান

ব্ল্যাকহোল থেকে কোন কিছু বের হতে পারে না, এমনকি সর্বাধিক গতি সম্পন্ন আলোও। এটাই চিরায়ত পদার্থবিদ্যার স্বীকার্য। তবে এই নীতিকে আর মানতে পারছেন না গবেষকরা, যাঁদের কাতারে প্রথমে আছেন ব্রিটিশ পদার্থবিদ প্রফেসর স্টিফেন হকিং । বর্তমানে এই ব্ল্যাকহোল নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম  বইয়ে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যা প্রমাণিত হলে যুগান্তকারী সৃষ্টি বলে প্রমাণিত হবে এই পৃথিবীতে।পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা জানতে পেরেছেন তা সামান্যই। তবে অতি সম্প্রতি যতটা তথ্য উদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন- তা যথার্থই অভাবনীয়, সাধারণ চিন্তার বাইরে।



হকিং রেডিয়েশনঃ

বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল, একটি গুরুভার নক্ষত্র মৃত্যুবরণ করলে ব্ল্যাক হোলে পরিনত হয় । ব্ল্যাকহোলই সম্ভবত মৃত নক্ষত্রের শেষ দশা। কিন্তু, ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্তিফেন হকিং বলেন যে, কোয়ান্টাম তত্ত কে বিবেচনায় নিলে ব্ল্যাক হোল কে পুরোপুরি ব্ল্যাক বলা যাবে না।তখন সেটি খুব সামান্য বিকিরণ নিঃসরণ করবে যা হকিং রেডিয়েশন নামে পরিচিত ।  ব্ল্যাকহোল ফোটন, নিউট্রিনো  হকিং রেডিয়েশন হিসেবে নিঃসরণ করবে ফলে ব্ল্যাক হোল ক্রমশ ভর হারাতে থাকবে

ব্ল্যাক হোল ও সময়

ব্ল্যাকহোল এর কাছাকাছি-  সময় অতি ধিরগতি সম্পন্ন হয়ে পরে । সময় স্থির হয়ে পরে । আইন্সটাইন এর তত্ত অনুযায়ী , সময় ধ্বংস হয়ে যায় ।

ব্ল্যাকহোল কি পৃথিবীকেও  গ্রাস করে ফেলবে ?

ব্ল্যাকহোল মোটেও স্পেস বা মহাশুন্যের এতটা কাছে ভ্রমণ করে না যে, তা কোন তারকা, চাঁদ বা গ্রহ কে তার শিকার বানাতে পারে। আর পৃথিবীও কোন দিন ব্ল্যাকহোলে গিয়ে পতিত হবে না। কারণ, কোন ব্ল্যাকহোলই কিন্তু পৃথিবীর সৌরজগতের এতটা কাছাকাছি নয়। যদি একটি সূর্যের সমান ভরের একটি ব্ল্যাকহোল সূর্যের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়, তবুও নয়।

কোন কোন ব্ল্যাকহোলের ভর সূর্যের সমতুল্য হতে পারে। কিন্তু তখনও পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলো ঐ ব্ল্যাকহোলকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান থাকবে। যেমনটা আগে ছিল! সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে- ব্ল্যাকহোল আমাদের জন্য এখনো কোনো হুমকির সংবাদ বয়ে আনেনি এবং অদূর ভবিষ্যতেও আনবে না বলে আশা করা হচ্ছে!

বিখ্যাত নারী জ্যোতির্বিদ Hlavacek- Larrondo বলেন, “মনে হয় আমরা যেই ধরনের আশা করেছিলাম তার চেয়ে বড় ও শক্তিশালী ব্ল্যাকহোল পাচ্ছি এবং তা যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক।”

ব্ল্যাকহোলকে মহাকাশের দানব বলে আখ্যায়িত করা হয়। ব্ল্যাকহোল এই মহাবিশ্বের অতি রহস্যময় ব্যাপার! আর বিজ্ঞানীরা নিরন্তর লেগেই আছেন এই রহস্যের পেছনে এবং আশা করা যায়, এই রহস্যের জাল থেকে একদিন বেড়িয়ে আসবে এই রহস্যময় ব্ল্যাকহোল। আমরা মহাবিসশের ভবিষ্যৎটাকেও জানতে পারব ভাল করে।

তথ্যসূত্রঃ
১. ব্ল্যাকহোল – শিশিরকুমার ভট্টাচার্য।

২. উইকিপিডিয়া

Author Image
Taohidur Rahman