নিউটনীয় প্যারাডক্স

নিউটনীয় প্যারাডক্স



নিউটন পড়ন্ত বস্তুর সূত্রগুলো গাণিতিক ব্যাখ্যা দিলেন। আর বললেন, মহার্কষ বলের প্রভাবেই কোনো বস্তু মাটিতে পড়তে বাধ্য হয়। এখানেও তৈরি হলো আরেক ধাঁধা।

গ্যালিলিওর পিসার হেলানো মিনারের মতো নিউটনকে নিয়েও একটা গালগল্প রয়েছে। আপেল পড়ার গলস্ন। এই গল্পের ঐতিহাসিক ভিত্তি কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। কিন্তু নিউটনের আপেল বিখ্যাত হয়ে গেছে। একটা উদ্ভট ধাঁধা এসেছিল নিউটনের মাথায়। কেন আপেল মাটিতে পড়ল? ওপরেও তো উঠে যেতে পারত? বড় শক্ত ধাঁধা। অ্যারিস্টোটল বলেছিলেন, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে সব বস্তুই ওপরে উঠতে চায়। কিন্তু কোপার্নিকাস, ব্রুনো, কেপলার আর গ্যালিলিওরা প্রমাণ করে দিয়েছেন পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। সেকথা পোপ না মানতে পারেন, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস না করতে পারেন, নিউটনের মতো মহাবিজ্ঞানী সেটা না মেনে পারেন না। সুতরাং নিউটনকেই খুঁজতে হলো সমাধান।
একদিন পেয়েও গেলেন। সেখানেও কেন্দ্রের ব্যাপার-স্যাপার আছে। তবে মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীর কেন্দ্র। এই ব্যাপারটিতে নিউটন অ্যারিস্টোটলের কাছ থেকে অনুপ্রাণীত হয়েছিলেন কিনা কে জানে। তবে পৃথিবীর কেন্দ্রের একটা আশ্চর্য গুণ আবিষ্কার করলেন নিউটন। যেসব বস্তু ওপর থেকে পড়ে তার আসল লড়্গ পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানে যেতে পারে না, মাটি তাকে ঠেকিয়ে দেয় বলে।
পৃথিবী যে আপেলকে মাটির দিকে টানছে, এর কারণ কী?
নিউটন হিসেব করে দেখলেন পৃথিবী আর আপেলের মধ্যে একটা আকর্ষণ বল কাজ করে। ঠিক যেমন আকর্ষণ কাজ করে সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যেও। নিউটন এই আকর্ষণ বলের কারণ হিসেবে পেলেন বস্তুর ভর। কিন্তু ভর কীভাবে আরেকটা বস্তুকে আকর্ষণ করে এই বিষয়টা নিউটনের জানা ছিল না। নিউটন শুধু, বললেন মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। সেটাই হলো মহাকর্ষ বল। বস্তু দুটা যত কাছাকাছি থাকবে, তাদের মধ্যে মহাকর্ষ বল তত শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ তত বেশি বলে বস্তু দুটো পরস্পরকে আকর্ষণ করবে। যে বস্তুর ভর যত বেশি, তারা আকর্ষণ করার ক্ষমতাও তত বেশি।নিউটন এই বলের নাম দিলেন মহাকর্ষ বল।
নিউটন বললেন, যে বল পৃথিবী আর আর সূর্যের মধ্যে কাজ করে, সেই একই বল কাজ করে পৃথিবী আর আপেলের মধ্যেও। অর্থাৎ গাছের আপেল মাটিতে পড়ে মহাকর্ষ টানের কারণেই।
আগেই বলেছি, দুটো বস্তুর ভর যত বেশি, তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল মহাকর্ষ বলও তত শক্তিশালী। তাহলে আপেলের ভর যত বেশি তত বেশি হবে। এখানেই কি তাহলে প্যারাডক্সের জন্ম হয় না? বস্তুর ভর বেশি হলে তার প্রতি মহাকর্ষীয় টানও বেশি হবে। তহালে সেই বস্তু কি তত দ্রুত পৃথিবীর দিকে পড়বে না।

অনেকেই এই বিষয়টা নিয়ে ধন্দে পড়ে যান। সত্যি বলতে কি, গ্যালিলিও পড়ন্ত বস্তুর সূত্রগুলো দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলোর গাণিতিক প্রমাণ গ্যালিলিওর হাতে ছিল না। পড়ন্ত বস্তুর সূত্রগুলো গণিতের ছাঁচে ফেলেন স্বয়ং নিউটন। এজন্য তিনি বিখ্যাত গিনি আর পালকের পরীক্ষা করেন।
গিনি হলো ধাতব মুদ্রা। আর পলক তো পাখির পাখনা। নিউটন সেদুটোকেই করেন হাতিয়ার। স্বাধীনভাবে পড়তে শুরু করে সে দুটো। ভাবুন তো এমন একটা পরীক্ষায় কী দেখা যাবে? হ্যাঁ, গিনিটা আগে মাটিতে পড়বে। বেশ কিছুক্ষণ পরে মাটি স্পর্শ করবে পালক। কারণ এখানে বাতাস পালকটাকে বাঁধা দিয়েছে। কিন্তু গিনিটাকে অতটা বাঁধা দিতে পারেনি। তাই সেটা আগে মাটিতে পড়েছে।
নিউটন এবার অন্যভাবে পরীক্ষাটা করলেন। যেখানে বাতাসের বাধা নেই। এজন্য তিনি একটা কাচের টিউবে ভরে ফেললেন গিনি আর পালকটাকে। তারপর টিউবটাকে করলেন বায়ুশূন্য। ঠিউবটাকে উল্টে দিলেন। গিনি আর পালক টিউবের ওপর থেকে নিচে নেমে এলো একই সাথে এতই গতিতে। নিউটন নিশ্চিত হলেন, পড়ন্ত বস্তুর ব্যাপারে গ্যালিলিও ঠিক ছিলেন। তিনি গ্যালিলিওর সূত্রগুলো গণিতের ভাষায় প্রকাশ করলেন।



অনেকেই পশ্ন তোলেন গ্যালিলিও পড়ন্ত বস্তুর সূত্র যদি ঠিক হয়, তাহলে সেটা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের লঙ্ঘন কিনা। নিউটন দিয়েছেন সমাধান। তিনিও ঠিক, গ্যালিলিও ঠিক। খোলা চোখে যতই স্ববিরোধ মনে হোক, দুটোই আসলে একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যখন পৃথিবীর মতো খুব ভারী আরেকটা ক্ষুদে আপেলে মতো বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষ বলের হিসাব নিকাশ করা হয়, তখন দৃষ্টিভঙ্গীটাও পাল্টাতে হবে। পৃথিবী আর সূর্য, দুটোর ভর সমান না হলেও দুটোই কিন্তু অনেক বেশি ভারি। তবু পৃথিবী সূর্যের কাছে আপেল বৈ কিছু নয়। সূর্যও মহাকর্ষ বল দিয়ে হেঁচকা টানে পৃথিবীকে তার বুকে টেনে নিতে পারত, ছাই-ভস্ম করে দিতে পারত পৃথিবীকে । কিন্তু পৃথিবী কম ত্যাঁদোড় নয়। দূূর থেকে মহাশক্তিকেও কাঁচকলা দেখানো সহজ। মহকর্ষ সূত্রের রয়েছে সেই কলার কারিশমা। দূরত্ব বেশি হলে মহাকর্ষীয় টান দুর্বল হয়ে যায়। পৃথিবী থেকে সূর্য অনেক অনেক দূরে। প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। সূর্যদেবে যত শক্তশালীই হোক, দূর থেকে হম্বিতম্বিই শুধু করতে পারে, পৃথীবিকে কান ধরে টেনে নামাতে পারে না। এখানেও রয়েছে নিউটনের সূত্রের কারিশমা। গতিসূত্র আর মহাকর্ষ সূত্র দুটোই।
নিউটনের গতির সূত্র বলছে, বাইরে থেকে কোনো বল দাদাগিরি না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে। কিন্তু গতিশীল বস্তু? তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানোর মতোও কোনো বল নেই। তাই একই গতিতে সেই বস্তু মহাশূন্যে চলতে থাকবে অনন্তকাল, যতক্ষণ না আরেকটা বস্তু এসে তার চলার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কোনো এক কালে পৃথীবীর আলাদা কোনো অসিত্ব ছিল না। সূর্যের জলন্ত অংশ ছিল। কোনো এক কারণে সূর্যের খানিকটা অংশ ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে মহাশূন্যে। ছিটকে চলার সময় অনেকগুলো অংশে ভাগ হয়ে যায়। কোনোটা চলে যায় অনেক দূরে কোনোটা থেকে যায় সূর্যের খুব কাছে। ছিটকে পড়া প্রতিটা অংশ পরিণত হয় একেকটা গ্রহে। পৃথিবীর জন্মও এভাবে।
পৃথিবী বা অন্য গ্রহরা, ছিটকে যদি বেরিয়েই পড়ল তাহলে মহাশূন্য হারিয়ে গেল না কেন? কেনই সূর্যের সাথে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রইল?



নিউটনের প্রথম আর তৃতীয় সূত্রেই রয়েছে এর সমাধান। যে বেগে সূর্যের একটা অংশ ছিটকে এসে পৃথিবী তৈরি করল, সেই বেগেই পৃথিবী মহাশূন্যে অনন্তকাল ধরে ছুটে চলতে পারত। পারেনি, সে সূর্যের শক্তিশালী মহাকর্ষ বলের দাদাগিরি কারণে। কোনো একটা বিস্ফোরণ সূর্য থেকে পৃথিবীকে ছিটকে দিয়েছিল ঠিক, সাথে সূর্যের মহাকর্ষ টান পৃথিবীর সেই ছিটকে চলে যাবার গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।
পৃথীবিকে যদি সূর্যের মহাকর্ষ টান টেনেই ধরে, তাহলে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর থেমে যাওয়া উচিৎ ছিল। সেটাই যদি হতো স্থির পৃথিবীকে সত্যি সত্যি হেঁচকা টানে আবার নিজের বুকে ফিরিয়ে নিত সূর্য। সেটা হয়নি, দুটি আলাদা বলের টানাটানি, মারামারি কারণে। আর সেখানেও হাজির নিউটন মহাশয়।
নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র বলে, দুটি সমান বল একই বস্তুর ওপর যদি খবরদারি করে, তাহলে সেই দুই বলের কেউই সেই বস্তুটাকে তাদের খুশিমতো চালাতে পারবে না। তখন দুটোর টানাটানির মাঝখান দিয়ে আরেকটা পথ বের করে নেবে সেই বস্তুটি।
পৃথিবীর ক্ষেত্রেও অনেকটা সেরকম ঘটনা ঘটেছে। সূর্যের বুক থেকে প্রবল বেগে ছিটকে আসা পৃথিবী অসীম মহাশূন্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। একই সাথে মহাকর্ষ বল পেছন দিকে টেনে ধরেছিল পৃথিবীকে। এখানে দুটো বল সক্রিয়। একটা বল তৈরি করছে পৃথিবীর গতিশক্তি। আরেকটা হলো মহকর্ষ বল। প্রথম দিকে পৃথবীর গতিশক্তি থেকে তৈরি বল সূর্যের মহাকর্ষ টানের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ছিল। তাই পৃথিবী সূর্যের বুক থেকে অনেকটা দূরে চলে আসতে পেরেছিল। কিন্তু ক্রমাগত মহাকর্ষীয় টান পৃথিবীর গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। ধীরে ধীরে বেগ কমে যায়, কমে যায় গতিশক্তি জনিত বলও। একটা সময় গতিশক্তিজনিত বল আর সূর্যের মহাকর্ষজনিত বল সমান হয়ে যায়। গতিশক্তিজনিত বল পৃথিবীকে সোজা মহশূন্যের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। আর সুর্যের মাকর্ষীয় টান বিপরীতে টানতে চাই। এই দুই বলের পাল্লায় পড়ে পৃথিবীর তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা’। কিন্তু কোনো বলই তো ছাড়বার পাত্র নয়। তখন পৃথিবীকেই তৈরি করে নিতে হয় বিকল্প পথ।
‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’র ঝামেলায় না গিয়ে পৃথিবী তখন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। কোটি কোটি বছর ধরে এভাবেই চলছে। মহাকর্ষ বল আর পৃথবীর সেই আদি ছিটকে যাওয়ার গতির দরুণ তৈরি বল দুদিকে টেনে ধরেছে পৃথিবীকে। তাই পৃথিবীও অবিরাম ঘুরে চলেছে সূর্যকে কেন্দ্র করে, সূর্যের সাথে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে।
চাঁদের ক্ষেত্রেও কিন্তু ঘটছে একই রকম ঘটনা। কোনো এক কালে চাঁদও পৃথিবী থেকে ছিটকে চলে যেতে চেয়েছিল অতলান্তিক মহশূন্যে। কিন্তু বাধ সেধেছিল পৃথবীর মহাকর্ষীয় বল। তাই চাঁদকেও ঘুরতে হচ্ছে পৃথিবীর চারপাশে।
এখন আসি আবার সেই পুরোনো প্রশ্নে। আপেলের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? আপেল যখন বোঁটামুক্ত হয়ে নিচের দিকে পড়ে, সেটা ওই মহাকর্ষ বল টানে বলেই। চাঁদ ছিটকে পৃথবী ছেড়ে মহাশূন্যে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু আপেল তো আর সেটা করেনি। আপেল শুধু গাছের বোঁটা থেকে আলগা হয়েছিল। শুধু মহাকর্ষ বল তাকে ডাক দিয়েছে।মহকর্ষ বল গতিশীল করেছে আপেলকে। যত পৃথিবীর কাছাকাছি কাছি এসেছে, তত আপেলের বেগ বেড়েছে। অর্থাৎ আপেল ত্বরিত হয়েছে।
এখন কথা হচ্ছে একটা আপেল আর একটা বিশাল পাথরের ভর সমান নয়। তাই তাদের ওপর ক্রিয়াশীল বলের মানও সমান নয়। তবু কোনো একটা পাথর আপেল কেন একই গতিতে নিচে নামবে, একই সাথে কেন মাটি ছোঁবে।
পড়ন্ত বস্তুটা থাকে পুরোপুরি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতর। পড়ন্ত গতির সাথে এর ভরের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে মহাকর্ষী ত্বরণের। একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় সকল বস্তুর জন্যই মহাকর্ষীয় ত্বরণের মান ধ্রুবক। অর্থাৎ সমান। তাই যে ভরের বস্তুই হোক বাতাসের বাধা যদি না থাকে সবগুলো সমান বেগে নিচে পড়বে। আমরা একটু অঙ্ক কষেও ব্যাপারটা দেখে নিতে পারি।

লেখকঃ আবদুল গাফফার রনি



Author Image
Faysal Nadim