কল্পবিজ্ঞান : সাগর তলের আতঙ্ক

কল্পবিজ্ঞান : সাগর তলের আতঙ্ক

শান্ত সাগর। চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি। গাঢ় নীল। আকাশটাও পরিষ্কার। সাগর আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার। মাঝখানে ডিমের কুসুমের মত টলমলে সূর্য। এক ঝাঁক অ্যালবাটার্স ঘুরছে জামিলদের ছোট্ট জাহাজকে ঘিরে। জামিল পায়াচারী করছেন জাহাজের ডেকে। বার বার কম্পাসে চোখ রেখে দেখে নিচ্ছেন তাঁদের বর্তমান অবস্থান। জাহাজ ছুটছে ঘণ্টায় ১৬ নটিক্যাল মাইল বেগে। উদ্দেশ্য গয়াল দ্বীপ। সেণ্ট মার্টিন থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণের এই দ্বীপটা একবারে জনমানবহীন। প্রাণী বলতে বেজি, খরগোশ, বনমোরগ, গুইসাপ আর এই জাতীয় ছোট ছোট কিছু প্রাণী। তবে বছর দশেক সেখানে বাস করেছেন বিখ্যাত জিনেটিক ইঞ্জিনিয়র ড. রামচরণ চ্যাটার্জি। বয়সে জামিলের চেয়ে বছর দশেকের বড়। কিন্তু আচরণে তাঁর প্রাণপ্রিয় বন্ধু। গত দশ বছরে লোকলয়ের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল না বলতে গেলেই চলে। হঠাৎ সপ্তাহখানেক আগে একটা চিঠি পান জামিল। প্রেরক ড. রামচরণ। সেন্টমার্টিন পোস্ট অফিসের সিলমোহর লাগানো।চিঠিটা খুলে জামিল হতবাক। হবারই কথা। পৃথিবীর কে কবে চাক্ষুস ডাইনোসর দেখেছে?
রামচরণ সেই সুযোগই করে দিচ্ছেন জামিলকে! চিঠিতে সেকথা বিস্তারিত লিখেছেন রামচরণ। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আমেরিকায় সফরে গিয়েছিলেন। এক ফসিলাবৃত্ত এলাকায় ছিল তাঁদের অভিযান। ডাইনোসরের ফসিল সংগ্রহ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। বেশ কিছু মূল্যবান ফসিলও পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে দামিটা পেয়েছিলেন ড. চ্যাটার্জি। ডিম্বাকৃতির একটা পাথর পেয়েছিলেন তিনি। কেজি পাঁচেক ওজন হবে। এক্স-রে পরীক্ষার পর নিশ্চিত হন ওটার ভেতরে ঘুমিয়ে আছে আস্ত একটা ডিম। রামচরণের দৃঢ় বিশ্বাস সেটা ডাইনোসরের ডিম না হয়ে পারেই না।
অভিযাত্রী টিমের ক্যাপ্টেনের বিশেষ শ্রদ্বাভাজন ছিলেন রামচরণ। তাই ফসিলটা নিজের কাছে রাখতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। ওই অভিযান শেষে দেশে ফিরেই চলে আসেন নির্জন গয়লা দ্বীপে। বিখ্যাত এক আমেরিকান কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতার দ্বীপে গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক এক গবেষণা কেন্দ্র। আমেরিকা, ভারত, সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রোলিয়া থেকে চারজন মেধাবি তরুণ বিজ্ঞানীকে সাথে নিয়ে লেগে পড়েন গবেষণায়। দীর্ঘ দশ বছরের গবেষণায় ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সাফল্যের মুখ দেখেছেন তাঁরা। ডিম থেকে অবমুক্ত হয়েছে প্রাগৗতিহাসিক যুগের ত্রাস ডাইনোসরের ছানা।
ছয় মাসে বাচ্চাটি বেশ নধর হয়েছে। সংকট ছিল খাবারের। ওব্যাটা উভচর। এটা ডাইনোসরের কোনো প্রজাতি নিশ্চিত হতে পারছি না। প্রথম দিকে সাগর থেকে মাছ ধরে খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু আকারে যত দ্রুত বেড়েছে ক্ষিদেও বেড়েছে সমানুপাতে। সুতরাং বাধ্য হয়ে ডাইনোসরটাকে সাঁতার শেখাতে হয়েছে। এজন্য কসরৎ করতে হয়নি মোটেও। রামচরণ ভেবেছিলেন ছানাটা টি-রেক্সের। কিন্তু যত বড় হয়েছে তত ছানাটা প্রমাণ করেছে সে টি-রেক্স নয়, অচেনা এক উভচর ডাইনোসর। এখন সাগরের তলদেশে তাণ্ডব চালাচ্ছে দানবটা। তবে মানুষের ভয়ের কিছু নেই। তবে কেন জানি মানুষের দিকে ওটার কোনো লোলুপ দৃষ্টি নেই।
চিঠির এক পর্যায়ে ড. চ্যাটার্জির অনুরোধ, ‘জামিল ডাইনোসরগুলো আমেরিকান কোম্পানিকে দেখানোর আগে তোমাকে দেখাতে চাই। নির্ভয়ে চলে আসতে পারো গয়লা দ্বীপে। তোমাকে দেখানোর জন্য ছটফট করছি।’
চিঠি পড়ার পর থেকে জামিল ও ছটফট করতে থাকেন। চাক্ষুস ডাইনোসর দেখা! এ-কী ভাবা যায়? সেদিনই ফোন করেন ব্যবসায়ী বন্ধু আতিক ইসলামকে। চট্টগ্রামের মানুষ। নিজের একখানা প্রোমদতরী আছে। জামিলের প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে যান আতিক সাহেব। ফোনেই জানিয়ে দেন যেন, পরদিনই গুছিয়ে চলে আসেন জামিল।
পরদিন নয়, সেদিন রাতেই রওনা দেন জামিল। বিমানে। পরদিন সকালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গয়লা দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আতিক ইসলামের প্রমোদ তরী ‘সাগরকন্যা’।
দুই
জামিল একবার কম্পাস আর একবার বিনোকুলারে চোখ রেখে দেখছেন। তর সইছে না তাঁর। এতটা উত্তেজিত বোধহয় জীবনে আর হননি। সেণ্টমার্টিন পৌঁছতেই দু’ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। সেখান থেকে আরও দু’ঘণ্টা পর পৌঁছলেন কাঙ্খিত গয়লায়।
‘ওই তো! ওই যে ড. রামচরণের ল্যাবরেটরি।’ জামিলের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর।
বিনোকুলারটা এগিয়ে দিলেন আতিক ইসলামের দিকে। তাতে চোখ লাগিয়ে হাসি ফুটল আতিক ইসলামের ঠোঁটেও। মিনিট দশেকের মধ্যে গয়লার উপকূলে নোঙ্গর ফেলল সাগরকন্যা। ক্যাপ্টেন মকবুল শেখ আর মেট হাসান রাজা জাহাজেই থেকে গেলেন। ইদানীং জলদস্যুদের উৎপাত বেড়েছে বড্ড। জাহাজ রেখে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। ছোট্ট প্রমোদ তরীকে কোথাও আড়ালে করে রাখার জন্য থেকে যায় তাঁরা।
তিন
গবেষণাগার তো নয়, বিশাল এক রাজপ্রাসাদ যেন। খোলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন আতিক আর জামিল। অবাক লাগল জামিলের। বন্যপ্রাণী কিংবা মানুষজন না থাকতে পারে, বাইরের লোক তো আসতে পারে যখন-তখন। জলদস্যুদের ভয়ও আছে। এভাবে গেট খোলা কেন?
যাই হোক ভেতরে ঢুকলেন দুই বন্ধু। বিশাল উঠোন পেরিয়ে উঠলেন বারান্দায়। দুই করিডরে বিভক্ত বাড়িটা। বামদিকের করিডরে তালা আঁটা। ডান দিকেরটা খোলা। আতিককে নিয়ে খোলা করিডর ধরে এগিয়ে গেলেন জামিল। নিচতলায় পাশাপাশি পাঁচটা রুম, তালা দেয়া। অগত্যা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন ওপরে। তার ওপরে আরও দুইটা ফ্লোর।
দ্বিতীয় তলার তিন নং রুমটার দরজা খোলা। ঢুকে পড়লেন দু’বন্ধু। বুঝতে বাকি রইল না রুমটা রামচরণ বাবুর। কিন্তু ঘরে কেউ নেই। হাঁকলেন জামিল, ‘রামদা, রামদা!’
জবাব নেই। তাঁর হাঁক প্রতিধবনি হয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে গেলেন জামিল আর আতিক ইসলাম। তৃতীয় আর চতুর্থতলায় সব ঘরেই তালা মারা। জামিল আতিককে নিয়ে নেমে এলেন নিচে। করিডর থেকে বেরিয়ে চলে এলেন বাড়ির পিছন দিকটায়। চারপাশ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাড়িটার মোট এরিয়া ত্রিশ একরের কম নয়। ক্রংক্রিটের রাস্তা বেয়ে এগিয়ে গেলেন তাঁরা। ততক্ষণ পৌঁছে গেছেন দুই নাবিকও। সামনেই একটা বাগান। ফলমূলের। সেটা পেরিয়েই চোখে পড়ল হ্যাচারি টাইপের একটা জায়গা। পাঁচ একরের কম নয় জায়গাটা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। হ্যাচারির ভেতরটা পুরো ক্রংক্রিটের। চারপাশে হাড়গোড়, হাঙ্গরের মাথার খুলি, তিমির লেজ। জামিলের বুঝতে বাকি রইল না, এটাই ডাইনোসরটার আস্তানা। ওটার বেরুনোর জন্য বিশাল দুটো দরজা–হ্যাচারিতে রেলিংয়ের একটা, আরেকটা বাড়ির পাঁচিলে।
জামিল জোরেশোরে হাঁক পাড়লেন রামবাবুর নাম ধরে। তাঁর সাথে গলা মেলালেন আতিক সাহেব এবং দুই নাবিক। তাদের হাঁক পাঁচিলে প্রতিধ্বনি করে ফিরে এলো, কিন্তু জবাব এলো না।ধক করে উঠল জামিলের বুকটা। তবে কি খারাপ কিছু ঘটেছে? সঙ্গিদের সাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন জামিল। চক্কর দিলেন ছোট্ট দ্বীপের পুরোটা। বিনোকুলারে চোখ রেখে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। সমস্বরে হাঁকলেন। কিন্তু সাড়া নেই কোনও।
‘চলো, আতিক।’ বন্ধুর উদ্দেশে বললেন জামিল। ‘বেডরুমেই হয়তো সমাধান আছে।’ প্রায় দৌড়ের ভঙ্গিতে আবার ওপরে উঠে গেলেন তাঁরা।
চার
বালিশের ঠিক পাশেই ছিল ডায়রিটা। আগেরবার চোখে পড়েনি। জামিল তুলে নিলেন ওটা। কালো চামড়ার কভারে মোড়ানো সুদৃশ্য এক ডায়েরি। ২০১৩ সালের। ডাইরিটা মেলে ধরলেন। আতিক সাহেব আর দুই নাবিকও ঝুঁকে পড়লেন ডাইরির ওপর। ১৭ নভেম্বরের ঘরে রয়েছে শেষ লেখাটা। তার মানে জামিলকে যেদিন চিঠিটা পোস্ট করেছেন, তার পাঁচদিন পরের। লেখা শেষ হয়েছে এই বাক্যটা দিয়ে:
‘কীভুল না করেছিলাম!’
পুরো লেখাটা এমন:
আজ শেষ সঙ্গীকেও হারালাম। অস্ট্রোলিয়ার ডেভিড হ্যামিল্টনে। অত্যন্ত সৎ, লাজুক ছেলে কিন্তু বুদ্ধিমান। শেষ পর্যন্ত নিজেকে মৃত্যুর মুখে সপে দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে গেল ছেলেটা। কিন্তু আমিই বা আর কতক্ষণ টিকব। খাবার পানি শেষ, খাদ্যও ফুরিয়ে এসেছে। বাড়িটার চারপাশে ইলেট্রিক শকের ব্যবস্থা রয়েছে বলে এখনো বেঁচে আছি। কিন্তু বাইরে আমাকে যেতেই হবে। হয়তো এই যাওয়াই শেষ যাওয়া। তাই ইলেট্রিকের সংযোগটাও কেটে দেব ভাবছি। জামিল যদি আসে, যদি দানবটার হাত থেকে রক্ষাও পায় তাহলে ইলেট্রিক শকে মরবে। সেটা তো হতে দিতে পারি না। জামিলই এখন শেষ ভরসা। ওর লেজার গানই পারে দানবটাকে সহজে কুপোকাৎ করতে। তা না হলে গোটা দুনিয়াকেই নরক বানিয়ে ফেলবে দানবটা।নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ছিলেন জামিল। লেজার গানের কথা উঠতেই পকেটে হাত রাখলেন। নেই! আসলে ওটা সাথে নেন-ই-নি। আজকাল সব অভিযানে ওটা নেন না। কারণ অনেকের লোলুপ দৃষ্টি আছে ওটার ওপর।
‘মস্ত একটা ভুল হয়ে গেছে!’ বিড় বিড় করে বললেন জামিল। তারপর আবার ডাইরিতে মনোযোগ দিলেন।
‘জামিল কি পারবে পৃথিবীকে এই দানবের হাত থেকে রক্ষা করতে? কী ভুল না করেছিলাম!’ উত্তেজনায় জামিলের হাত কাঁপছে। ধপ করে বসে পড়লেন তিনি।
ডায়রিটা একেবারে শুরু থেকে পড়া শুরু করলেন। কীভাবে ডাইনোসোরের ডিমটা ফোটানো হলো, কীভাবে সেটাকে লালন-পালন করলেন, কীভাবে সেটাকে নানা-বিষয়ে পারদর্শি করা হলো–তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে। ১ নভেম্বর তারিখে এসে জামিলের চোখ আটকে গেল:
“আজ ডাইনোসরট একটা মাছ শিকার করে খেয়েছে। আমাদের চোখের সামনে। ওকে ছেড়ে আমরা তীরে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখে বিনোকিউলার ছিল বলে দেখতে অসুবিধা হয়নি। যাক বাঁচা গেল। এখন ওর খাবার নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।”
৩ নভেম্বর
আজ টি-রেক্স গভীর সমুদ্রে চলে গিয়েছিল। কী শিকার করে খেয়েছে বুঝতে পারছি না। তবে পেট যে ভর্তি, তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল।
৬ নভেম্বর
আজ এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখলাম। সমুদ্রের ত্রাস হাঙ্গরও যে কত অসহায় হতে পারে চোখে না দেখলে বিশ্বাস হত না। আজ আমার চার সহকারীকে নিয়ে ডাইনোসরটাকে ফলো করেছিলাম। ইয়েটে চড়ে। পাঁচ নটিক্যাল মাইল অগ্রসর হওয়ার পরেই যেন ঝড় উঠল শান্ত সাগরের বুকে। সাগরের ত্রাস বিশাল সাইজের হাঙরদের দিশেহারা করে ছেড়েছে আমাদের দানবটা। টপাটপ একজোড়া হাঙরকে ছিঁড়ে-খুবলে খেয়েছে। বাকিরা জান নিয়ে পালিয়েছে কোনমতে।
১০ নভেম্বর
আজ আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। শীত-শীত লাগছিল। সকালে গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে নেমে এলাম তীরে। সোনাঝরা রোদে শরীরটা একটু উত্তপ্ত করতে চাই। কিন্তু নিচে নেমেই চোখ চড়কগাছ! বিশাল এক নীল তিমি মরে পড়ে আছে বালিয়াড়ীর ওপর। ক্ষত-বিক্ষত। শরীরের অর্ধেকটা খুবলে খাওয়া। বুঝতে বাকি রইল না এটা আমাদের ডাইনোসরের কাজ। এখন ওটাকে আর তালাবন্দি করা হয় না। ইচ্ছেমত সাগর থেকে খাবার যাতে সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য। কিন্তু নীল তিমির মতো বিশাল দানবকে খেয়ে ফেলতে পারে একথা মাথায়ই আসেনি কখনও।
১২ নভেম্বর
আজ জামিলকে চিঠি লিখলাম। সেণ্টমার্টিন যেতে হয়েছিল এজন্য। জামিলকে ডাইনোসরটা না দেখানো পর্যন্ত তৃপ্তি পাচ্ছি না। চিঠি করে পৌঁছুবে জানি না। অপেক্ষায় রইলাম।
১৫ নভেম্বর
দুধ-কলা দিয়ে কি কালসাপ পুষলাম? এই শোক সইব কেমন করে? সব তো ঠিক মতই চলছিল। হঠাৎ আজ বিগড়ে গেল কেন ডাইনোসরটা। তবে কি আমাদের জিন গবেষণায় ভুল ছিল। তা-ই যদি হয়, তবে আমার ভুলে প্রাণ গেল সাউথ আফ্রিকার গবেষক জোহান এমেকোর। ওর ওপর দায়িত্ব ছিল ডাইনোসরের স্বাস্থ্য পরীক্ষার। সপ্তায় দুদিন ও সেটা করত।
আজ সকালে সে কাজেই গিয়েছিল এমেকো। হঠাৎ ওর আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এলো হ্যাচারির দিক থেকে। দ্রুত নেমে সেখানে পৌঁছলাম আমরা। এ বিভীষিকা চোখে দেখা যায় না। এমেকোর পুরো দেহটা গিলে ফেলেছে দানবটা। শুধু পা দুটো বাইরে বেরোনো। কিন্তু কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ও-দুটোও তলিয়ে গেল দানবটার পাকস্থলিতে। আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ভয়ঙ্কর আক্রোশে তেড়ে এলো এল দানবটা। প্রাণ বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে ওপরে উঠে এলাম। সিঁড়ির দরজাটা সময়মত আটকাতে পেরেছিলাম বলে রক্ষা। এ যাত্রায় নাহয় বেঁচে গেলাম, কিন্তু এর মেয়াদ কতক্ষণ। কতক্ষণ দানবটার সাথে লড়তে পারব। খাদ্য-পানির জন্য আমাদের নিচে যেতেই হয়। বিশেষ করে খাবার পানির ফিল্টারটা নিচেয়। তাছাড়া বাজার ঘাট করতেও সেণ্টমার্টিন যেতে হয়। তবে আশার কথা দানবটা সবসময় দ্বীপে থাকে না। আশা থাকলেই বা কী, মনটা জোহানের জন্য ভারী হয়ে আছে।
১৬ নভেম্বর
আজ আরও দুই সঙ্গীকে হারালাম। আমেরিকার জন টেরি আর ভারতীয় অমরেশ চক্রবর্তী। ওরা গিয়েছিল পানির ফিল্টার চালু করতে। তার আগে আগে অবশ্য বিনোকুলার আর শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে গোটা দ্বীপটাকে তন্ন তন্ন করে দেখে নেয়া হয়েছে দানবটা আশেপাশে আছে কিনা। ভালোই ভালোই ফিল্টার আর পাম্প মেশিন স্টার্টও দিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাম্প ঘর থেকে বেরুনোর সাথে সাথে ভোজবাজির মতো কোথা থেকে উদয় হয় দানবটা। দু’জনকেই আস্ত গিলে ফেলে। ওদের চিৎকার শুনে বন্দুক নিয়ে জানালায় দাঁড়িয়েছিলাম। অমরেশকে ধরার আগে মুহূর্তে গুলি চালিয়েছিলাম। কিন্তু বন্দুকের গুলিতে সামান্যও বিচলিত করা গেল না দানবটাকে। আমার চোখের সামনেই গিলে ফেলল অমরেশকে। কী বিভৎস! কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! আমি বোধহয় পাগলই হয়ে যাব।
‘তারমানে, রামবাবুকেও সাবাড় করেছে দানবটা।’ বললেন জামিল। ‘আমরা ভাগ্যক্রমে এখানে পৌঁছতে পেরেছি। এখন এই ভাগ্যের ভরসাতেই পালাতে হবে। খবর দিতে হবে প্রশাসনকে। খুব শীঘ্রি দানবটাকে ঘায়েল করতে না পারলে পুরো ভারত মহাসাগর জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে দানবটা। প্রয়োজনে এনাইহিলিন গানটা নিয়ে এসে ভ্যানিশ করে দেব জানোয়ারটাকে।’
‘এখন করণীয় আমাদের?’ বললেন আতিক ইসলাম।
‘পালাতে হবে। এখুনি চলো জাহাজে উঠি, দানবটা আসার আগেই।’
নিরাপদেই ইয়টে পৌঁছে গেলেন জামিলরা।
পাঁচ
দ্রুতই জাহাজ ছাড়ার নির্দেশ দিলেন ক্যাপ্টেন। শুরু হলো উল্টেযাত্রা। আধঘণ্টা বেশ ভালভাবেই কেটে গেল। শান্ত সমুদ্র, পরিষ্কার আকাশ, মৃদুমন্দ বাতাস, ফেনিল জলরাশি, অ্যালবাটার্সের ঝাঁক জাহাজের পিছু নিয়েছে, কোথাওবা ডলফিনের কেরদানী–সব মিলিয়ে স্নায়ুচাপ বেশ কমিয়ে দিয়েছিল প্রকৃতি। হঠাৎ কালো মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ। নীল সমুদ্রও যেন নীল রং হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠল।
‘ঝড় আসছে!’ মুখ কালো করে বললেন ক্যাপ্টেন। আকাশের কালো মেঘের মতই তাঁর চেহারার দুশ্চিন্তার ঘনঘটা। আশেপাশে আর কোনো জাহাজও নেই যে ভরসা পাবেন। দেখতে দেখতে প্রবল এক ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানল সাগরের বুকে। ফুলে ফেঁপে উঠল পানি। ভয়ঙ্কর গর্জন ছাড়ল সাগর। পাহাড়ের মত বড় বড় ঢেউ এসে আঘাত করল সাগরকন্যার গায়ে। মনে হচ্ছে, সমুদ্রের তাণ্ডবনৃত্যে বাদামের খোসার মতো হারিয়ে যাবে ছোট্ট ইয়ট। কিন্তু দুই নাবিক অপূর্ব দক্ষতায় জাহাজটার হাল ধরে রেখেছেন। তবে শেষ রক্ষা করতে পারবেন কিনা তাঁরা নিশ্চিত নন। হঠাৎ প্রচণ্ড এক ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে পড়ল জাহাজের মাস্তুল। এবার বুঝি সলিল সমাধি হয় জামিল সহ চার অভিযাত্রীর।
ক্যাপ্টেন চেষ্টা করছেন, বড় কোনো জাহাজের সাথে রেডিও যোগাযোগ করা যায় কি না। অনেক চেষ্টার পরে সম্ভব হলো। ততক্ষণে উড়ে গেছে ইয়টের ডেকের ছাদ। প্রবল ঝড় ওর হিম বৃষ্টির পুরোটায় আঘাত হানছে নাবিকদের শরীরে। ঝড়ের তাণ্ডবে মরার ভয় তো আছেই, সাথে যোগ হলো প্রবল ঠাণ্ডার জমে যাওয়ার আশঙ্কাও।
ক্যাপ্টেনের বেতার সংকেত সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসছিল অস্ট্রেলিয়ায় এক মালবাহী জাহাজ। কিন্তু প্রবল ঝড়ের ঝাপটায় কিছুতেই সাগরকন্যার পাশে ঘেঁষতে পারছে না। মালবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন হতাশ গলায় জানিয়ে দিলেন, তাঁদের কিছুই করার নেই। চলে যায় সেই জাহাজ। জামিল ধরেই নিয়েছেন মরতে চলেছেন তাঁরা। ডেকের অনেক নিচের বড়সড় একটা ফাটল দেখা দিয়েছে। গল গল করে পানি ঢুকছে তাতে। সেই সাথে বৃষ্টির পানি তো আছেই। ইয়টের ছোট্ট হোসপাইপটা দিয়ে আর কত পানি সেঁচা যায়। দৈবক্রমে যেন রক্ষা পেল সাগরকন্যা। ঝড়-বৃষ্টি যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল তেমনি আচমকা বিদায় নিল। ধড়ে প্রাণ পেলেন অভিযাত্রীরা। কিন্তু সাহায্যকারী জাহাজটা আর আশেপাশে নেই। নিজেদের চলার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। যাত্রীরা সবাই লেগে গেলেন ভাঙাচোরা জাহাজের মেরামত করতে। দু’ঘণ্টার প্রচেষ্টায় সফলও হলেন তাঁরা। কিন্তু হাজির স্বয়ং মৃত্যুদূত!
ছয়
যাত্রীরা ক্লান্ত। বিশেষ করে জামিল। ক্যাপ্টেন আর মেট সমুদ্রে চলাচলে অভ্যস্ত। অনেকবারই ঝড়-ঝাপটা সহ্য করতে হয়েছে। তাঁদের অবস্থা তুলনামূলক কিছুটা ভালো। সবচেয়ে ভালো আতিক ইসলামের। তিনি ব্যবসায়ী মানুষ। বিলাসী। ঝড়ের সময়ও কেবিন ছেড়ে বের হননি। জাহাজে শুকনো খাবার ছিল। এসিও আছে। মেট হাসান রাজা জামিলকে খাবার আর পানি দিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ কেবিনে গিয়ে বসতে। জাহাজের ছোট-খাটো সমস্যাগুলো সারিয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন দুই নাবিক।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন আতিক ইসলাম। জামিল গিয়ে বসলেন তার পাশে।
‘খুব ভয় পেয়ছ বুঝি?’ বললেন জামিল।
‘পাব না! মাঝ সমুদ্রে এমন ঝড়, ভাবা যায়, ওহ। ভাগ্য বেঁচে গেছি। ’
‘আমি একটু ঘুমাব, আতিক। ডেকে খাবার আছে, খেয়ে আসতে পারো।’
‘ঠিক বলেছো।’ বললেন আতিক ইসলাম। ‘বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে, যাই।’
আতিক উঠে গেলেন। জামিল আতিক ইসলামের বেডে শুয়ে পড়লেন।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন বলতে পারবেন না জামিল। ঘুম ভাঙল হাসন রাজার ডাকে। ‘স্যার দানবাটা হামলা করেছে।’
‘সর্বনাশ!’ বলে যে অবস্থায় ছিলেন সেভাবেই চলে এলেন পাটাতনে। ক্যাপ্টেন ধরে আছেন জাহাজের হুইল।
দানবটা তার লেজ দিয়ে জাহাজের গায়ে বাড়ি মারার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাড়িটা ঠিকমত লাগল না। শুধু লেজের আগাটা আলতো করে ছুয়ে গেল জাহাজের গাঁ। তাতেই সাগরকন্যা যেভাবে দুলে-টলে উঠল, ঘণ্টাখানেক আগের প্রবল ঝড়েও ততটা টলেনি। দ্রুত জাহাজের খোল থেকে একটা রাইফেল আর হাঙ্গরমারা হারপুন নিয়ে এসেছে মেট। অস্ত্র বলতে এ দুটোই। বিশাল দানবের বিপক্ষে একবারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ।
দানবটা বিশাল হাঁ করে মাথাটা উঁচু করল আকাশপানে। তারপর সাপের মতো ছোবল দেয়ার চেষ্টা করল সাগরকন্যার পাটাতন লক্ষ্য করে। সাথে সাথে গর্জে উঠল জামিলের রাইফেল। গুলিটা বোধহয় বিঁধল ডাইনোসরটার নাকের নিচে। সাময়িক দমে গেল দানবটা। ছোবলটা আর হানতে পারল না পাটাতনের গায়ে। তবে বেড়ে গেল রাগ। প্রবল আক্রোশে লেজ দিয়ে মারল আরেকটা ঝাপটা। এবার পালের খুঁটিগুলে পাঁক্যাটির মতো চুরমার হয়ে গেল। সাফল্যের উৎসাহে হানল আরও একটা লেজের আঘাত। এবার ইঞ্জিনরুমের ছাদ উড়ে গেল। অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন ক্যাপ্টেন।
বিরাট হাঁ করে আবারো ধেয়ে এলো পাটাতনের দিকে। লক্ষ্য জামিল আর মেট। হাসন রাজা হারপুন ছুঁড়ল দানবটার মগজ লক্ষ্য করে। হারপুন গেঁথে গেল দানবটার কানের ওপরে। এবারও লক্ষ ভ্রষ্ট হলো ছোবল। ক্ষেপে যেন উন্মাদ হয়ে উঠল জুরাসিক যুগের দানব। পিছিয়ে গিয়ে জাহাজের পেছন দিকের পাটাতনে বসালো জোর কামড়। ডিমের খোসার মত চুরমার হয়ে গেল পেছনের অংশটা।
এর মাঝেও জাহাজ চলছিল। কিন্তু এগুতে পারছিলেন না ক্যাপ্টেন। বেতারে যোগাযোগ করছিলেন। বহুদূরে রয়েছে একটা মালবাহী জাপানী জাহাজ। পৌঁছতে আন্তত আধঘণ্টা সময় লাগবে। তাছাড়া এই দানবের বিপক্ষে তাঁরাই বা কী করবে। ডাইনোসরের কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবে কিনা সন্দেহ। রামচরন বাবুর গবেষণাার কথা স্পন্সর কোস্পানিটা ছাড়া আর কেউ জানে না। বাংলাদেশ সরকারও নয়। তবে ভরসা ড. জামিল আছেন ইয়টে। বাংলাদেশ সরকারের কানে খবরটা পৌঁছতে পারলেই যথেষ্ট।
ক্যাপ্টেন জাপানি জাহাজের ক্যাপ্টেনকে বললেন, ড. জামিল মৃত্যুর মুখে। বাংলাদেশ নেভিকে যেন খবরটা পৌঁছে দেন তিনি।
জাহাজের পাটাতন ভাঙার পর আবারও মুখ তুলল ডাইনোসর উদ্দেশ্য আবার জামিল কিংবা মেট। জামিল তখন শূন্য রাইফেল রিলোডে ব্যস্ত। হারপুন প্রস্তুত। এবার মরণ আঘাত হানতে চায় মেট। দানবটার চোখ সই করে হারপুন ছুঁড়ল সে। কিন্তু দানবটা দ্রুত মাথা নামিয়েছে, লক্ষভ্রষ্ট হলো হারপুন। বিশাল ছোবলটা নেমে এল মেটের দেহ বরাবর। তবে সময়মত দেহটাকে সরিয়ে নিতে পারল সে। পাশেই ছিল বিশাল সাইজের দুটো গ্যাস সিলিন্ডার। মেটকে বাগে না পেয়ে সিলিন্ডারে কামড় বসাল ডাইনোসর। জামিলের রাইফেল প্রস্তুত। গুলি করবেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে তাঁর মাথায়।
রাইফেলের নল তাক করলেন দানবটার মুখ লক্ষ্য করে। টিপে দিলেন ট্রিগার। প্রবল একটা বিস্ফোরণ হলো দানবটার মুখের ভেতর। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল গ্যাস সিলিন্ডার। বিস্ফোরণে উড়ে গেল ডাইনোসর মাথা। কাটা কলাগাছের মতো সাগরের পানিতে হুড়মুড় করে পড়ল জুরাসিক যুগের দানবটার উর্ধাঙ্গ। তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠল আশপাশের পানি।  তারপর সব শান্ত।
মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলেন চার অভিযাত্রী।
লেখা স্বত্বঃ আবদুল গাফফার রনি
Author Image
Faysal Nadim