আলোর তরঙ্গতত্ত্বঃ থমাস ইয়াংয়ের কালজয়ী দ্বিচির পরীক্ষা

আলোর তরঙ্গতত্ত্বঃ থমাস ইয়াংয়ের কালজয়ী দ্বিচির পরীক্ষা




বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী আলোর উপর গবেষণা ও তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। নিউটন ছিলেন আলোর কণাতত্ত্বে বিশ্বাসী। এসম্পর্কে আমার আগের পর্বে জেনেছি। আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় আলোর তরঙ্গতত্ত্ব।

শুরুর কথা

আলো যে এক প্রকার তরঙ্গ এ কথা ১৬৭৮ সালে সর্বপ্রথম বলেন ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস। তিনি বললেন আলো তার উৎস হতে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পরে। তরঙ্গ তত্ত্ব সম্পর্কে জানার আগে একটু তরঙ্গ কী সেটা জেনে নিই। তরঙ্গ মানে ঢেউ;কম্পন। পুকুরের পানি সচরাচর শান্ত। পুকুরে ঢিল মারলে সেখানে পানির ঢেউ তৈরি হবে। কিন্তু কেন এই ঢেউ তৈরি হলো? কারণ পানিতে ঢিল ছোড়ার পর ঢিলটি সেখানকার পানির অণুগুলোতে আঘাত করে। ফলে অণুগুলোর ভেতর কম্পন তৈরি হয়। কম্পনরত অবস্থায় অণুগুলো তার পাশের অণুতে আঘাত করে। এভাবে আঘাত করতে করতে পানিতে তা ঢেউয়ের সৃষ্টি করে।

এবার ফিরে আসা যাক আলোর তরঙ্গ তত্ত্বে। হাইগেনস বললেন আলো তরঙ্গ আকারে চলে। কিন্তু এবারও প্রশ্ন থেকেই গেলো শূন্য মাধ্যমে আলো কীভাবে চলে? তার কাছে কোনো প্রমাণ বা যুক্তি ছিল না। নিউটনের মতো তিনিও ফিরিয়ে নিয়ে আসলেন ইথার তত্ত্ব। প্রচীন বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করত সমগ্র মহাবিশ্বই ডুবে আছে ইথারের মধ্যে। হাইগেনস বললেন আলো উৎস থেকে তরঙ্গাকারে ছড়িয়ে পরে ইথারের মহাসমুদ্রে। তারপর তা ইথারের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পরে। নিউটনের কণা তত্ত্ব আলোর অপবর্তন,ব্যাতিচার ব্যাখ্যা করতে পারত না। কিন্তু তরঙ্গতত্ত্ব দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা যায়।তারপরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েই গেল। যেমন আলো তরঙ্গ হলো তো ছায়া পরার কথা নয়। হাইগেনসের তরঙ্গতত্ত্ব এর ব্যাখ্যা দিতে পারল না। তার উপর সেসময় বিজ্ঞানী মহলে নিউটনের ব্যাপক প্রভাব। তাই নিউটনের কণাতত্ত্বের প্রভাবে হাইগেনসের তরঙ্গতত্ত্ব চাপা পরল।

ইয়াংয়ের কালজয়ী দ্বিচির পরীক্ষা

হাইগেনস এর পর আর কেউ তরঙ্গতত্ত্বের পরীক্ষামূলক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। তবে সেটা প্রমাণ হলো ১২৩ বছর পর। এক ব্রিটিশ পদার্থবিদ থমাস ইয়াং প্রমাণ করলেন। একটি কথা বলে রাখা দরকার এ পরীক্ষাটি সর্বপ্রথম করেন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো মারিয়া গ্রিমাল্ডি। তার সে পরীক্ষা হয়তো নিউটনের কণাতত্ত্বের প্রভাবেই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি।

থমাস ইয়াং

ফিরে আসি ইয়াংয়ের পরীক্ষায়। ইয়াং পরীক্ষাটি করার জন্য একটি অন্ধকার ঘর নিলেন। সেখানে একটি কাঠবোর্ডের পেছনে কিছু দূরত্বে আরেকটি মসৃণ কাঠবোর্ড রাখলেন। প্রথম কাঠবোর্ডটিতে তিনি পাশাপাশি দুটি ছিদ্র করলেন মেঝে থেকে একটু উঁচুতে।প্রথম কাঠবোর্ডের সামনে একটি টেবিলে মোমবাতি রাখলেন ছিদ্র দুটির সমান উচ্চতায় এবং মোমবাতিটি ছিদ্র দুটির মাঝ বরাবর স্থাপন করলেন। এতে করে আলো দুই ছিদ্রের উপর সমান ভাবে পরবে। এবার তিনি যে ফলাফল পেলেন তা রীতিমত মাথা খারাপ করে দেয়ার মতো। নিউটনের তত্ত্বানুযায়ী আলো কণা হলে ছিদ্র দুটি দিয়ে প্রবেশ করা আলো অবশ্যই সরলরেখায় গিয়ে পেছনের কাঠবোর্ডে গিয়ে পরবে। সেখানে দুটি আলোক বিন্দু তৈরি হতো।

কণাতত্ত্ব অনুসারে আলো সরলপথে যাওয়ার কথা

কিন্তু ইয়াং মোটেও এমন ফল পেলেন না। তিনি দেখলেন শুধু দুটো বিন্দু তৈরি হয় না। একটি উজ্জ্বল বিন্দুরর পাশে আরেকটি অন্ধকার বিন্দু;তার পাশে আরেকটি উজ্জ্বল বিন্দু এভাবে ছড়িয়ে গেল। আবার আলো এমন ভাবে ছড়িয়ে পরেছে যে দেখে মনে হলো তা একটি বিন্দু হতে আসছে এবং বিন্দুটি ওই ছিদ্র দুইটির মাঝ বরাবর অবস্থান করছে।

ইয়াংয়ের পরীক্ষার ফলাফল

ইয়াং তার পরীক্ষার ফলাফল দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন যে আলো আসলেই এক প্রকার তরঙ্গ। পরীক্ষালব্ধভাবে প্রথম প্রমাণিত হলো আলো এক প্রকার তরঙ্গ। এর সাথে সাথে নিউটন-হাইগেনস এর সময়ের মতো ইথার ধারণা জোরালো ভাবে আঁকড়ে ধরল বিজ্ঞানমহলে।

ইয়াংয়ের পরীক্ষার ফলাফল বিজ্ঞানীমহলের সবাই মেনে নিল। তবে ম্যাক্সওয়েল ইথারের সাহায্যে ব্যাখ্যা দিতে নারাজ ছিলেন। আগামী পর্বে আমরা ইথার সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।

আগের পর্বঃ আলোর কণাতত্ত্ব: স্যার আইজ্যাক নিউটন ও তার প্রিজমের পরীক্ষা 

তথ্যসূত্রঃ
১. কোয়ান্টাম ফিজিক্স-আবদুল গাফফার রনি।

২. Quantum Physics-Lvovsky, Alexander

৩.  উইকিপিডিয়া

 


Author Image
Faysal Nadim