আমরা কী আলো দেখতে পাই?

আমরা কী আলো দেখতে পাই?



আলোর কণা ও তরঙ্গ দুই ধর্মই আছে। স্বাভাবিক ভাবেই আমরা আলোর ঝলক যেখানে-সেখানে দেখতে পাই। ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি কাজ করছে, সেখান থেকে আলোর ঝলক আসে। কোথাও আগুন জ্বলছে দাও দাও করে, সেখোন থেকেও আলোর ঝলক আসে। বাসা বাড়িতে বিদ্যুতের বাল্ব, হ্যারিকেন—কত কিছুই না আলোর উৎস। এগুলো থেকে কত আলোয় না ঝাঁকে ঝাঁকে এসে আমাদের চোখে আঘাত হানছে। সেই আলো থেকেই তো তো দেখছি। আলো দিয়ে দেখছি।

কিন্তু আমরা আলোকে দেখছি কি?

প্রশ্নটা যতটা নিরীহ মনে হচ্ছে, ততটা মোটেও নয়। আলোর উৎস দেখা মানে আলো দেখা নয়।

দেখার কিছু শর্ত আছে। এজন্য দরকার ভালো দুটি চোখ, আলো, আর বস্তু। অন্ধকারে আলো থাকে না তাই আমরা দেখতে পাই না। আবার অন্ধরা দেখতে পায় না, কারণ তাদের ভালো দুটি চোখ নেই। কিন্তু আলো আছে, চোখও আছে, কিন্তু যদি দেখার বস্তু না থাকে, তাহলে কি আপনি দেখতে পাবেন? ধরুন, মহাশূন্যের এমন জায়গায় আপনি আছেন, যেখানে কোনো বস্তুই নেই। চরাচর জুড়ে শূন্যতা। একটা আলোর উৎস আছে মাত্র। আপনি তখন কী দেখবেন? নিজের হাত-পা, শরীর দেখবেন। আর দেখবেন আলোর উৎস। কিন্তু আলো দেখবেন কি?

আপনার ঘরের এনার্জি সেভার বাল্ব, টিউব লাইট কিংবা এলইডি বাল্বগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন। সেগুলেতে অতি সাদা রংয়ের আলো দেখবেন। কিন্তু সেটাও ঠিক আলো দেখা নয়। দেখছেন টিউব বা বাল্বের গায়ে সাদা রংয়ের এক ধরনের রাসায়নিক প্রলেপ থাকে। আপনি আসলে সেই রাসায়নিকের প্রলেপটাই দেখছেন। আবার আগে যে স্বচ্ছ বৈদ্যুতিক বাল্ব ছিল সেটাতে তাহলে মানুষ কী দেখতে? বাল্বের কাচ আর যেখানে আলো তৈরি হয়, সেই টাংস্টেনের স্প্রিংটা উত্তপ্ত হয়ে উঠত, সেটাই দেখত মানুষ। কিন্তু আমরা জানতে চাই আলো নিজে দেখা দেয় কিনা?

কেউ কেউ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবেন, না দেখার কি আছে! প্রতিদিন কত শত আলোকরশ্মিই না দেখি। আসলেই কি তাই? আলোক রশ্মি কি আসলেই দেখা যায়? আলোক রশ্মির আকারে যা দেখি সেগুলো আসলে বাসাতে উড়ে বেড়ানো ধুলোবালিই দেখি। আলোক রশ্মি যদি দেখতে পেতাম, তাহলে সূর্য থেকে আসা প্রতিদিন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন আলোক রশ্মিই দেখতে পেতাম। আলোক রশ্মিই ছটার অন্য কিছুই তখন আমাদের চোখে পড়ত না।

আমরা কেন দেখি?

একথা সবার জানা, সূর্য বা কোনো আলোক উৎস থেকে আলো যখন কোনো বস্তুর ওপর পরে তখন সেই বস্তু কিছু আলো শোষণ করে বাকিটা ফিরিয়ে দেয়। একে আলোর প্রতিফলন বলে। প্রতিফলিত এই আলোকরশ্মি যখন আমাদের চোখের রেটিনায় এসে পড়ে তখনই আমরা সেই বস্তুটাকে দেখতে পাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমনটা হয়?

চোখের রেটিনার পেছনে মস্তিষ্কের ভেতর একটা আলোক সংবেদি পর্দা আছে। রেটিনার লেন্সে আপতিত আলোক রশ্মি একত্রিত হয়ে সেই পর্দার ওপর যে বস্তু থেকে আলোক রশ্মি আসছে সেই বস্তুটির প্রতিবিম্ব তৈরি করে। তখনই আমরা ওই বস্তুটা দেখতে পাই। কোনো কারণে চোখের রেটিনা কিংবা মস্তিষ্কের আলোক সংবেদি ওই পর্দা ঠিকমতো কাজ না করলে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।

আবার আমরা ফিরে আসি আগের প্রসঙ্গে। ধরা যাক, আপনি অমাবশ্যার অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছেন ছাদে। আপনার হাতে আছে একটা টর্চ লাইট। এবার টর্চ লাইটটা অন করে একটা আলোকরশ্মি ফেলুন। দেখবেন, একটা সোজা আলোক রশ্মি ওপর দিকে উঠে গেছে। তারমানে আপনি আলোক রশ্মিটা ঠিকই দেখতে পাচ্ছেন। এটাও আসলে আলোক রশ্মি নয়। বাতাসে উড়ে বেড়ায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ধুলোবালি। আলো সোজা পথে চলে। আপনার টর্চ থেকে বেরোনো আলো ধুলোবালির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সেগুলো কে আলোকিত করেছে। অর্থাৎ ধুলোবালির ওপর পড়া আলো প্রতিফলিত হয়ে কিছু আপনার চোখে পড়ছে। তাই যে রশ্মিটা দেখছেন সেটাকে কখনোই আপনি আলোক রশ্মি বলতে পারেন না।

আলো একই সাথে কণা এবং তরঙ্গ চরিত্রের। এর কণা চরিত্র আছে বলেই আলোক-তড়িৎক্রিয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটে। আবার তরঙ্গ চরিত্র আছে বলেই এদের ব্যতিচার-অপবর্তন ঘটে, বেতার তরঙ্গের মতো আলোগুলি কংক্রিট কিংবা ইস্পাতের দেয়াল পর্যন্ত ভেদ করে যায়। আলোর কণার নাম ফোটন। কিন্তু সেই ফোটন আবার অদ্ভুত চরিত্রের। এদের ভরবেগ আছে আবার ছোটেও সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার গতিতে। আলোর কণা-ধর্মের কারণেই বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসতে পারে আলো। তাই আমরা একে দেখতে পাই।অর্থাৎ দেখার জন্য আলোর কণা ধর্ম বড় একটা ভূমিকা পালন করে। তাহলে কেন আলোকে দেখা যাবে না?

 

আমরা আরেকটু বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যেতে পারি। আমরা কোয়ার্ক, ইলেকট্রন, প্রোটন কিংবা কিংবা নিউট্রনের মতো ক্ষুদে বস্তু কণাদের দেখতে পারি না। এমনকী পরমাণু পর্যন্ত দেখা যায় না। অবশ্য আজকাল ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে পরমাণু দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এসব খুদে কণা দিয়ে যেসব বস্তু তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে ঠিকই দেখতে পাই। আপনার চারপাশে যেসব কণা রয়েছে, সবই শেষমেষ ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন দিয়ে তৈরি। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায়-সকল বস্তুই আসলে কোয়ার্ক আর ইলেকট্রন দিয়ে তৈরি।

ইলেকট্রন, কোয়ার্ককে দেখা যায় না। কিন্তু সেগুলো দিয়ে তৈরি বস্তুকে ঠিকই দেখতে পাই। তাই একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তাহলে ফোটন দিয়ে তৈরি আলোক রশ্মিকে কেন দেখা যাবে না?

এখানেই চলে আসে বোসন আর ফার্মিওনের ফারাকটা। ১৯২০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সত্যেন বোস আর মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন মিলে গড়ে তোলেন বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান। এই পরিসংখ্যান দিয়ে খুদে কণিকাদের আচার-আচারণ ব্যাখ্যা করতে চাইলেন কণা বিজ্ঞানীরা। কিন্তু দেখা গেল সব কণিকাদের আচরণ এই পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করতে পারে না। তখন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পল ডিরাক আর ইতালিয়ান বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানটিকে পরিমার্জন করে নতুন এক পরিংসংখ্যানের জন্ম দিলেন। বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান যেসব কণাদের চরিত্র ব্যাখ্যা করতে পারে না, ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান সেগুলোর ব্যাখ্য দিতে পারে। তখন কণা বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের সকল কণাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেললেন। যেসব কণা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে তাঁদের নাম দেওয়া হলো বোসন। আলোর কণা ফোটন, ডব্লিউ ও জেড এবং হিগস কণিরা হলো বোসন কণা। অন্যদিকে যেসব কণা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মানে, তাদের নাম দেওয়া হলো ফার্মিওন। ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, নিউট্রনো হলো ফার্মিওন শ্রেণির কণার উদাহারণ।

ফার্মিয়ন কণা দিয়ে আমাদের চারপাশের বস্তু জগত তৈরি। অন্যদিকে বোসন কণারা হলো বলবাহী কণা। তড়িচ্চুম্বকীয় বল, সবল ও দুর্বল নিউক্লিয় বলের বাহক হিসেবে কাজ করে বোসন কণা।

তারমানে একটা বিষয় নিশ্চিত, বোসন বস্তু কণা নয়। তাই এদের দিয়ে কোনো দৃশ্যমান বস্তু তৈরি সম্ভব নয়। এরা অন্য বলের বাহক হিসেবে কাজ করে। আলোর ফোটন কণাই যেমন, তড়িচ্চম্বকীয় বলের প্রভাব এরা বয়ে নিয়ে যায় দূর দূরান্তে। আবার কোনো বস্তু বিকিরণ আকারেও ফোটন বেরিয়ে আসতে পারে। সেই ফোটন ওই বস্তুকে চোহারা-সুরত কেমন সেটা আমাদের জানিয়ে দেয়। জানিয়ে দেয় আসার পথে অন্য কোনো বস্তুতে প্রতিফলিত হলে সেই বস্তু সম্পর্কে নানা তথ্য। কিন্তু নিজে বস্তু কণা নয় বলে এরা নিজেদের কখনো দেখা দেবে না।

 

লেখকঃ আবদুল গাফফার রনি



Author Image
Faysal Nadim